Published on
:
2 min read
প্রদীপ চক্রবর্তী, শ্রীরামপুর
বছরখানেক আগে ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে হিমাদ্রি দাশগুপ্তের। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে চিকিৎসা। তবে চিকিৎসার প্রধান উপকরণ রক্ত। হিমাদ্রির রক্তের গ্রুপ ও–নেগেটিভ। প্রতি মাসে একটি থেকে দু’টি, কখনও আবার তিন ইউনিট রক্তের প্রয়োজন।পড়শি থেকে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের কর্মীরা সরাসরি রক্ত দিয়েছেন, কেউ আবার সরকারি ও বেসরকারি ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে রক্ত জোগাড় করে হিমাদ্রির পাশে দাঁড়িয়েছেন। এবারে ষষ্ঠীর দিন আচমকাই হিমাদ্রিকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। পুজোর ছুটি পড়ে যাওয়ায়, চিকিৎসার জন্য ও–নেগেটিভ রক্তের খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়ে তাঁর পরিবার। অনেক চেষ্টার পরে অষ্টমীর দিন রক্তের ব্যবস্থা করে শ্রীরামপুর শ্রমজীবী হাসপাতালের ব্লাড সেন্টার।
একই সমস্যার মুখে পড়ে রক্তের অভাবে একরত্তি ছেলেকে নিয়ে বিপদে পড়েছিলেন ডানকুনির ঊষা মান্না। ছেলে জন্ম থেকেই থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত। রক্ত ছাড়া চিকিৎসা অসম্ভব। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শ্রীরামপুর ওয়ালশ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল থেকে রক্তের জোগান দিয়ে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে দেওয়া হয়। শেওড়াফুলির বাসিন্দা এক রোগী ভর্তি ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় রক্ত না পেয়ে যান মাণিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাডব্যাঙ্কে, সেখানেও রক্ত না পেয়ে ছুটে আসেন শ্রমজীবীতে। চন্দননগর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন চন্দননগরের বাসিন্দা শমিত বন্দ্যোপাধ্যায়, বি–পজিটিভের মতো কমন গ্রুপের রক্ত পেতেও তাঁকে নাকাল হতে হয়। দুর্গাপুজো থেকে উৎসবের মরশুমে রক্ত সঙ্কট ঘুম উড়িয়েছে স্বাস্থ্যকর্মী থেকে রোগীর আত্মীয়দের।
রক্তদাতা সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের কথায়, উৎসবের আবহে রাজ্যে রক্তের সঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। রক্তের অভাবে আটকে যাচ্ছে বহু অপারেশন, ভুগছেন প্রসূতি মায়েরা, কষ্ট পাচ্ছেন ক্যান্সার ও থ্যালাসেমিয়ার রোগীরা। অথচ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে রক্ত এমন একটি জরুরি উপাদান, যা কোনও কারখানায় উৎপাদন করা যায় না। রক্তের অভাবে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। কলকাতা–সহ নানা এলাকার ব্লাডব্যাঙ্ক থেকে মুমূর্ষু রোগীর বাড়ির লোকজন ছুটে আসছেন শ্রীরামপুরে গণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্লাড সেন্টারে। রক্ত ও রক্তরস জোগানে বড় ভরসা গণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা শ্রমজীবী হাসপাতালের ব্লাড সেন্টার, কিন্তু সেই ব্লাড সেন্টারও সেপ্টেম্বর মাসে চাহিদা অনুযায়ী শিবির করতে না পারায়, এখন উৎসবের সময়ে ভুগছে রক্তাল্পতায়। পরিস্থিতি বদল করতে শ্রমজীবী হাসপাতালের সদস্যরা ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে, আবেদন রাখছেন, উৎসবের মরশুমে অন্তত একটি রক্তদান শিবির করার।
শ্রমজীবী হাসপাতালের সহ–সম্পাদক গৌতম সরকারের বক্তব্য, ‘উৎসবের আবহে আমরাও নিশ্চয়ই উৎসবে মেতে উঠব, পাশাপাশি, আমাদের সামাজিক বোধের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকাও পালন করব। শ্রমজীবী হাসপাতালের পক্ষ থেকে সমস্ত পুজো কমিটির কাছে বিশেষ ভাবে আবেদন করা হচ্ছে, জগদ্ধাত্রী পুজোর মধ্যে পুজো কমিটির সুবিধামতো দিনে অন্তত একটি রক্তদান শিবির আয়োজন করে বিপন্ন সহ নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর।’ শ্রমজীবী ব্লাড সেন্টারের প্রবীণ চিকিৎসক নীরজরঞ্জন দাসের কথায়, ‘এই প্রচারে অনেক পুজো কমিটিই আমাদে আমন্ত্রণে সাড়া দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা আশা করব, উৎসবের সময়ে রক্তের সঙ্কটের মোকাবিলা করার।’ শ্রীরামপুর এভারেস্ট স্পোর্টিং ক্লাবের পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ দেবলীনা ভট্টাচার্য বলেন, ‘শ্রমজীবী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে এসে আবেদন করেছেন, আমরা চেষ্টা করছি, পাশাপাশি, অন্যদেরও অনুরোধ করছি শিবির আয়োজন করার।’
নবগ্রাম ঘোষাল পাড়া যুব সঙ্ঘের সদস্য সনৎ পাল বলেন, ‘এই দায়িত্ব আমাদের সবার, সবাই মিলেই সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হবে।’ শ্রীরামপুর সেবাকেন্দ্র ও চক্ষুব্যাঙ্ক রক্ত সঙ্কটের মোকাবিলায় আজ, লক্ষ্মীপুজোর দিন স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের উদ্যোগ নিয়েছে।সংগঠনের সদস্য শুভ্রজিৎ মৈত্র বলেন, ‘লক্ষ্মীপুজোর দিনটা বেছে নিয়েছি, কারণ, এটা সঙ্কটের সময়। আমরা দিনকে গুরুত্ব দিইনি, সমস্যাটাকে গুরুত্ব দিয়েছি। সমস্ত ব্লাডব্যাঙ্ক রক্তশূন্য। তাই আমরা চাই, সবাই এগিয়ে আসুন।’
