The Sangbad · অর্থনীতি
প্রবৃদ্ধি নয়, মানুষের জীবনমানই অর্থনীতির লক্ষ্য
১৫/১০/২০২৬

এ বছর বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক ভিত্তি উন্নয়নের জন্যতাদের যৌথভাবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ১২ অক্টোবর এই পুরস্কার ঘোষণা করে।তাদের গবেষণার স্বীকৃতিতে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে শুধু সামগ্রিক পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলেই চলে না, বরং পরিবার, ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশাও বুঝতে হয়।অর্থনীতি বলতে আমরা সাধারণত প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয় বুঝি। কিন্তু এসব সামগ্রিক সূচকের পেছনে কাজ করে কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কোনো পরিবার কতটা ব্যয় করবে, কতটা সঞ্চয় করবে, কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন কারখানা স্থাপন করবে কি না কিংবা পণ্যের দাম কখন পরিবর্তন করবে—এসব সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবেই অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারিত হয়। রবার্ট ই. হলের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পরিবারের ভোগব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে প্রত্যাশার সম্পর্ক।তার ১৯৭৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা দেখায়, মানুষের ব্যয়ের সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান আয়ের ওপর নির্ভর করে না; ভবিষ্যৎ সম্পদ ও আয় সম্পর্কে নতুন তথ্যও ভোগব্যয়কে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে, মাইকেল উডফোর্ড আধুনিক মুদ্রানীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।তার গবেষণায় সুদের হার, মূল্য নির্ধারণ, মানুষের প্রত্যাশা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্তের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকাশিততার ‘ইন্টারেস্ট অ্যান্ড প্রাইসেস: ফাউন্ডেশন অব এ থিওরি অব মনিটারি পলিসি’ গ্রন্থটি আধুনিক মুদ্রানীতির আলোচনায় বিশেষভাবে পরিচিত ও সমাদৃত।দুই অর্থনীতিবিদের গবেষণার তাৎপর্য হলো, অর্থনীতির সামগ্রিক ওঠানামাকে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আচরণের সঙ্গে যুক্ত করে আরও কার্যকর নীতিনির্ধারণের ভিত্তি তৈরি করা। বিশ্ব অর্থনীতি সব সময় একই গতিতে চলে না। কখনো উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়। আবার কখনো অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে। ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছিল। অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণ এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের কার্যকারিতা আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন দেখা দেয়। হল ও উডফোর্ডের গবেষণা এমন মডেল বিকাশে অবদান রাখে, যেগুলোতে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, প্রত্যাশা এবং বাজারের আচরণকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারার গবেষণা থেকে বিকশিত আধুনিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেলগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে অর্থনৈতিক ধাক্কার সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ এবং উপযুক্ত নীতিগত প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে সহায়তা করে। তবে কোনো মডেলই সব পরিস্থিতিতে নিশ্চিত সমাধান দিতে পারে না; নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করে সংকটের ধরন, সময় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর।অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ও আর্থিক পরিস্থিতি পরিচালনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে, সরকার কর, সরকারি ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনীতির চাহিদা এবং উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে। এতে ঋণ নেওয়ার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং ভোগ ও বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত কঠোর নীতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপও সৃষ্টি করতে পারে। আবার মন্দার সময় উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে। এখানেই নীতিনির্ধারণের সূক্ষ্মতা। অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা না বুঝে শুধু সুদের হার পরিবর্তন কিংবা সরকারি ব্যয় বাড়ানো-কমানো যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রত্যাশা, বাজারের প্রতিক্রিয়া এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতাও বিবেচনায় নিতে হয়।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ এবং বাজারের অনিশ্চয়তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এ বাস্তবতায় হল ও উডফোর্ডের গবেষণা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মূল্যস্ফীতির কারণ চিহ্নিত না করে শুধু সামগ্রিক চাহিদা কমানোর চেষ্টা করলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার পাশাপাশি সরকারের ব্যয়, করনীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যকারিতাও বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা দরকার। মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আস্থাশীল হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে। চতুর্থত, প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি তার সুফল কারা পাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার বা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি নয়; মানুষের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান এবং বাস্তব আয়ের উন্নতিও এর অংশ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এসব নীতি প্রয়োগের সময় স্থানীয় বাস্তবতা, সরবরাহব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য, উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হবে। উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা সরাসরি অনুকরণ করাই যথেষ্ট নয়।অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আলোচনা শুধু মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা সুদের হার নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আয়ের বৈষম্য, সম্পদের সুষম বণ্টন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। একটি দেশের অর্থনীতি তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যখন তার উন্নয়নের সুফল সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে পৌঁছায়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা কঠিন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।অর্থনৈতিক নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা। সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার, আর্থিক খাতে সুশাসন এবং নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োগ অর্থনীতির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে। এই আস্থা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণার আলোচনায় যে বৃহত্তর শিক্ষা উঠে আসে, তা হলো অর্থনীতির বিভিন্ন উপাদানকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার না করে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝতে হবে। তবে অর্থনৈতিক মডেলকে বাস্তব জীবনের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না; বরং তথ্য, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়, বরং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার গুরুত্ব পায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সার্থকতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে, তার ভিত্তিতে।অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা কেবল তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর বিশ্লেষণ, বাস্তবসম্মত মডেল এবং নীতির সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মডেলকে বাস্তব তথ্য দিয়ে যাচাই করা এবং সময়ের সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা সংশোধন করাও জরুরি। অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নতি। প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, মূল্যস্ফীতি মানুষের আয়কে ক্ষয় করে কিংবা উন্নয়নের সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সামাজিক তাৎপর্য সীমিত হয়ে পড়ে। রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা অর্থনৈতিক নীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।তাদের কাজ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যদি তথ্যনির্ভর, সমন্বিত ও জনকল্যাণমুখী নীতি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতিকর প্রভাব কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথ সুগম করা সম্ভব। অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা স্থিতিশীল, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗