বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এ পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল ও গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। এ লক্ষ্য পূরণে বাড়ানো হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন সক্ষমতা। বিশেষ করে চীন, ভারত ও ইউরোপের দেশগুলো এক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বলে জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর গতি রফতানিকারক দেশগুলোর তুলনায় তিন গুণ। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ডিএনভির (ডিএনভি) এনার্জি ট্রানজিশন আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর নীতিতে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দামের ওঠানামা ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে এসব দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এ প্রবণতাকে আরো জোরালো করেছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছরে চীন, ভারত ও ইউরোপের প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারে জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত উৎসের অংশ বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও রাশিয়ায় এ বৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
ডিএনভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুট ওরবেক-নিলসেন বলেন, ‘জ্বালানি রূপান্তরের কৌশল এখন আগের তুলনায় বেশি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। অস্থিতিশীল জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি গ্রহণের গতি বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোয়। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি রফতানিকারক অনেক দেশ এ রূপান্তরে তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এ পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত কিংবা জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে তখন বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়। পাশাপাশি বাড়ে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি।
গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নেই। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে হুমকি ও অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা ফের আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
ডিএনভির প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের মাত্রা পৌঁছেছে ইতিহাসের অন্যতম গুরুতর পর্যায়ে। তবে কৌশলগত মজুদ ব্যবস্থার কারণে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে চীনের কৌশলগত জ্বালানি মজুদ এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় শিক্ষা। শুধু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কিনে চাহিদা পূরণ করলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে এসব দেশ।
জ্বালানি রূপান্তরের এ প্রবণতায় চীনের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ও গ্যাস আমদানিকারক। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি কেনে চীন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে দেশটির অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীন একদিকে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ করছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, বায়ুবিদ্যুতের টারবাইন ও ব্যাটারি উৎপাদনে দেশটি বিশ্ববাজারে বড় সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ চীন একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির বড় ক্রেতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির বড় উৎপাদক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক জ্বালানি তেল উৎপাদনে মধ্যপ্রাচ্যের হিস্যা কমে প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গত বছর এ হিস্যার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরতা কমে আসার সম্ভাবনা দেখছে ডিএনভি।
জ্বালানি রূপান্তরের বড় একটি ক্ষেত্র হলো বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো। কলকারখানা, যানবাহন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে এখন জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
ডিএনভির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দশকে ইউরোপ, চীন ও ভারতে বিদ্যুতের মোট চাহিদা গড়ে ৬২ শতাংশ বাড়বে। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় এ চাহিদা বাড়তে পারে ৪৭ শতাংশ।
এছাড়া জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম উদ্দেশ্য গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারলে কার্বন নিঃসরণও কমানো সম্ভব। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলার লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছে ডিএনভি।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ বর্তমান মাত্রার তুলনায় ৪৪ শতাংশ কমতে পারে। তবে এ হ্রাস নিট শূন্য নিঃসরণের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট হবে না। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে আরো বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে।
