অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযান, ধরপাকড় ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরও জোরদার করেছে ইসরায়েল। দক্ষিণ পশ্চিম তীরের হেবরনে গুলির ঘটনায় দুই ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং আরও কয়েক ইসরায়েলি সেনা আহত হওয়ার পর পুরো পশ্চিম তীরে সর্বাত্মক অবরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে হেবরন শহরে অবিলম্বে অবরোধ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ওই ঘটনার পর শহরটির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। অভিযান চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের আটক করা হচ্ছে। হেবরনে গুলির ঘটনার আশপাশে ফিলিস্তিনিদের বহু স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন উগ্র ডানপন্থি ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ।
শুক্রবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনের উত্তর প্রবেশপথের কাছে একটি সামরিক চৌকির আশপাশে গুলির ঘটনা ঘটে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে গুলির খবর পেয়ে সেনাদের পাঠানো হয়। পরে দুই সন্দেহভাজন হামলাকারীকে হত্যার কথা জানায় বাহিনী। এ ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেসকিউ ইউনিটের দুই সদস্য নিহত হন। তারা হলেন স্টাফ সার্জেন্ট রন ইয়োনাতান রয়টম্যান ও সার্জেন্ট ইউভাল শাই সিভিলেম। এ ছাড়া আরও তিন সেনা সামান্য আহত হন বলে জানায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলি জরুরি সেবার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন আহত হন।
ঘটনার পরপরই হেবরন শহরে অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেন নেতানিয়াহু। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান এবং সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে শুক্রবার থেকেই ‘পূর্ণাঙ্গ অবরোধ’ কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এ ঘটনার পর নেতানিয়াহু তার দল লিকুদের সব নির্বাচনী কর্মসূচি বাতিল করে হেবরনে যান। সেখানে তিনি সামরিক অভিযানের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
হেবরনে গুলির ঘটনার পর ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছেন নেতানিয়াহু। শুক্রবার হেবরন সফরের সময় তিনি বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহরে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে শরণার্থী শিবিরগুলোতে পরিচালিত অভিযানের ধরন অনুসরণ করবে ইসরায়েলি বাহিনী।
নেতানিয়াহু বলেন, হামলাকারীরা যেসব এলাকা থেকে এসেছে, সেসব এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা প্রবেশ করবে, বাসিন্দাদের সরিয়ে দেবে এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাবে। পাশাপাশি কথিত ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস করা হবে। তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে বড় পরিসরে অভিযান চালানোর জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত রয়েছে। এর আগে ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীরে নজিরবিহীন সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, এ বিষয়ে তিনি একটি বিস্তৃত অভিযান পর্যালোচনা করেছেন। এর বাস্তবায়নের সময় পরে নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে হেবরনে গুলির ঘটনার স্থানের কাছাকাছি বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী এরই মধ্যে হেবরনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরটির একটি পরিবারের কয়েকটি বাড়িতে অভিযান চালান সেনারা। এ সময় পরিবারের একাধিক সদস্যকে আটক ও মারধর করা হয়। পরে তিন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হেবরনে গুলির ঘটনার প্রভাব পড়েছে পশ্চিম তীরের অন্যান্য শহরেও। আলজাজিরার প্রতিবেদক নিদা ইব্রাহিম অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে জানান, হেবরনের ঘটনার প্রায় দুই ঘণ্টা দূরত্বে অবস্থিত রামাল্লার প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রায় সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি রাজনীতিক মুস্তফা বারঘুতি বলেন, নেতানিয়াহু পশ্চিম তীরের ওপর চলমান অবরোধ আরও কঠোর করছেন। এর ফলে প্রতিটি শহর ও ছোট গ্রাম কার্যত একটি করে ছোট কারাগারে পরিণত হচ্ছে। আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ সামরিক চৌকি রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে সামরিক ফটক। এসবের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনপদগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। মানুষের স্বাভাবিক চলাচল, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পশ্চিম তীরে উত্তেজনা ও সামরিক অভিযান জোরদার হওয়ার মধ্যে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ড্রোন হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের আল-নাসর এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। এতে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এদিকে পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে ইসরায়েলি সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন দেশটির উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং গাজা পুরোপুরি দখলের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন।
বেন-গভির বলেন, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসনের’ ব্যবস্থাও তারা চান। গাজা পুরোপুরি দখল করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, গাজাকে একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব, তবে সেখানে হামাসের কোনো সদস্য থাকা চলবে না।
