জীবন এত অনিশ্চিত, বিপন্ন, ইন্টারেস্টিং। কারণ, জীবনে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে একটি ব্যাপার আছে। যাকে আমরা বলি ‘সারপ্রাইজ’।
দিল্লির যন্তর মন্তরে সবরকম আন্দোলন বন্ধ। এমনকী, সেখানে প্রবেশের সব পথও। কিন্তু মঙ্গলবার ভোররাতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র আশুতোষ রাঙ্কা, আজিঙ্কা শিন্ডে, সৌরভ দাস জাতীয় পতাকা নিয়ে ব্যারিকেড টপকে যন্তর মন্তর চত্বরে ঢুকে পড়েন। সে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল! পুলিশ এই আন্দোলনকারীদের আটক করেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, দিল্লি পুলিশ এ ঘটনায় যতটা অপ্রস্তুত, ততটাই অবাক। অপ্রত্যাশিত, আচমকা এই আন্দোলনকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘সারপ্রাইজ’ আন্দোলন নামে।
রাহুল গান্ধী সম্প্রতি এ বার্তাও দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বাতিলের দাবিতে যে-আন্দোলন চলছে, তাতে ভবিষ্যতে ‘সারপ্রাইজ এলিমেন্ট’ বা অপ্রত্যাশিত ঘটনার প্রবণতা আরও বেশি থাকবে। জীবন তো ‘সারপ্রাইজ’ বা আচমকা ঘটনায় ভরা। কখন কী ঘটবে কেউ জানি না। এ কারণে জীবন এত অনিশ্চিত, বিপন্ন, ইন্টারেস্টিং। জীবনে ‘সারপ্রাইজ’ না থাকলে, বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্যে বিস্ময় না থাকলে, আমাদের জীবন হত গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের মতো, যে সারাজীবন ক্রমাগত একই কাজ করে যাচ্ছে। সে একটা পাথরকে পাহাড়চূড়ায় ঠেলে তুলে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু প্রতিবার পাহাড়চূড়ার কাছে সিসিফাসের হাত ফসকে পাথর গড়িয়ে নেমে যায় নিচে। সিসিফাস আবার লেগে যায় পাথরটাকে পাহাড়চূড়ায় তোলার কাজে। নোবেলজয়ী আলবেয়ার কামু অবশ্য বলেছেন, সিসিফাস যেভাবে মেনে নিয়েছে বাস্তব জীবনের এমন উদ্ভট আচরণ, এই অ্যাবসার্ডিটি, সেটাই সঠিক কাজ। এবং জীবনের এই উদ্ভট একঘেয়েমি মেনে নিতে না পারলে তো বেছে নিতে হয় আত্মহত্যা! জীবনে অপ্রত্যাশিত ঘটনার মায়া যেন ঢেকে রাখে অস্তিত্বের অর্থহীন একঘেয়েমির সেই যাতনা। এই যে রাহুল গান্ধী ঘোষণা করলেন, আগামী দিনের আন্দোলন পরিচিত পথে না এগিয়ে ক্রমশ চমকপ্রদ হয়ে উঠবে, এতে দিল্লি পুলিশও কিছুটা চনমন করে উঠতে পারে।
সারপ্রাইজের জন্য, বিশেষ করে ‘প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ’-এর জন্য, আমরা প্রত্যেকে অপেক্ষা করি। চেতন মন সবসময় বুঝতে পারে না- চমক লাগানো অপ্রত্যাশিতর জন্য এই প্রতীক্ষা। কিন্তু অবচেতন মনে বহু স্তরে প্রবাহিত থাকে চমকের অপেক্ষা, আশা, আকাঙ্ক্ষা। ‘সারপ্রাইজ’ আমরা চাই। মাঙ্গলিক চমক আমাদের প্রার্থনায় থাকে। ‘সারপ্রাইজ’ জীবনের ভার হালকা করে। এ কারণেই রহস্য সাহিত্য আমরা পড়তে এত ভালবাসি। যাঁর লেখায় যত বেশি অপ্রত্যাশিত ঘটনার ভিড়, তিনি তত বেশি আমাদের প্রিয় লেখক। শিশুদের বিস্মিত হওয়ার প্রবণতা বড়দের থেকে অনেক বেশি। তুলনায় চমকের প্রতি বড়দের সাড়া যে নানা ধরনের সংশয়ের কামড়ে বিড়ম্বিত, বিঘ্নিত। মহাবিশ্ব ধরা দিয়েছে আমাদের গণিত ও বিজ্ঞানের কাছে। এর থেকে বড় বিস্ময় আর নেই! বলেছিলেন স্বয়ং সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। খাঁটি কথা।
