পর্দায় সাহসী পোশাকে হাজির হওয়া, চুম্বন ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয়, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খোলামেলা অবস্থান—সব মিলিয়ে একসময় ভারতীয় বিনোদনজগতে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মল্লিকা শেরওয়াত। আজ ২৪ অক্টোবর মল্লিকার জন্মদিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অভিনয়জীবনকে নতুনভাবে দেখতে চাইছেন এই অভিনেত্রী। শুধু গ্ল্যামারের পরিচিতি নয়, অভিনয়ের অন্য দিকগুলোও দর্শকের সামনে তুলে ধরতে চান তিনি। কমেডি চরিত্রে কাজ করার আগ্রহের পাশাপাশি ভারতের মহাকাশচারী কল্পনা চাওলার জীবন নিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে রিয়েলিটি শো ‘দ্য ট্রেইটর্স’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে অংশ নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
‘মার্ডার’ বদলে দিয়েছিল জীবন
১৯৭৬ সালের ২৪ অক্টোবর হরিয়ানার রোহতকে জন্ম মল্লিকার। তাঁর জন্মনাম রীমা লাম্বা। অভিনয়ে আসার পর মল্লিকা শেরাওয়াত নামটি গ্রহণ করেন। দর্শনশাস্ত্রে পড়াশোনা করা এই অভিনেত্রীর বলিউডে অভিষেক ২০০৩ সালে ‘খোয়াইশ’ ছবির মধ্য দিয়ে। তবে তাঁকে সারা ভারতে পরিচিত করে তোলে ২০০৪ সালের ‘মার্ডার’। ছবিতে ইমরান হাশমির বিপরীতে অভিনয় করে রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন তিনি।
পরিচালক অনুরাগ বসুর এই ছবিতে মল্লিকা অভিনয় করেছিলেন সিমরান নামের এক বিবাহিত নারীর চরিত্রে। দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি, পরকীয়া, আকর্ষণ ও অপরাধের জটিলতা নিয়ে নির্মিত ছবিটি সে সময়ের মূলধারার বলিউডে সাহসী উপস্থাপনার জন্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। ছবিটির কাহিনিতে ঘনিষ্ঠতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর সেই সূত্রেই মল্লিকার পর্দায় উপস্থিতি নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা।
‘মার্ডার’ ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি মল্লিকার ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি পরিচয় ‘সেক্স সিম্বল’। তাঁর অভিনয়, সংলাপ কিংবা চরিত্রের মনস্তত্ত্বের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পোশাক ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে।

মল্লিকা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর সাহসী পর্দা-উপস্থিতিকে ঘিরে সমাজের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। তাঁর মতে, নিজের শরীর ও সৌন্দর্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া কিংবা পর্দায় সাহসী চরিত্রে অভিনয় করা লজ্জার বিষয় নয়। ‘মার্ডার’-এ বিকিনি পরার সিদ্ধান্তকেও তিনি নিজের শরীর নিয়ে স্বচ্ছন্দ থাকার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের জন্য প্রশংসা নয়, শুনতে হয়েছিল অপমান
মল্লিকার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয়। ‘মার্ডার’-এর পর তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক কৌতূহল। তবে এই পরিচিতি তাঁকে যতটা জনপ্রিয়তা দিয়েছে, ততটাই তৈরি করেছে নানা ধরনের পূর্বধারণা।
২০২৪ সালে এক পডকাস্টে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মল্লিকা জানান, ‘মার্ডার’-এর সাফল্যের পর বলিউডের কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর কাছ থেকে তাঁকে তাচ্ছিল্যের মুখে পড়তে হয়েছিল। তাঁর দাবি, কয়েকজন অভিনেত্রী তাঁকে অপমানজনক ভাষায় কথা বলেছিলেন। এ কারণে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন এবং একসময় নিজের পরামর্শদাতা পরিচালক মহেশ ভাটের কাছে গিয়ে কেঁদেছিলেন।
মল্লিকার বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিতে সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করায় তাঁকে এমনভাবে বিচার করা হতো, যেন পর্দার চরিত্রের সঙ্গে তাঁর বাস্তব জীবনের কোনো পার্থক্য নেই। কিছু মানুষ তাঁকে শুধু শরীরী আবেদন দিয়ে বিচার করতেন; একজন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর যোগ্যতা কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দকে গুরুত্ব দিতেন না।
এখানেই শেষ নয়। মল্লিকা আরও অভিযোগ করেছেন, কিছু পুরুষ সহ-অভিনেতা তাঁর পর্দার ঘনিষ্ঠ দৃশ্যকে বাস্তব জীবনে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্মতি হিসেবে ধরে নিতেন। তাঁর দাবি, ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ হতে রাজি না হওয়ায় কয়েকটি ছবির কাজও হারিয়েছিলেন তিনি।
মল্লিকার বর্ণনা অনুযায়ী, কোনো অভিনেত্রী পর্দায় চুম্বন বা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করলেই তাঁর ব্যক্তিগত সীমারেখা আর থাকে না—এমন ধারণা থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। তিনি এই অভিজ্ঞতাকে কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্য ও অসম্মানের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এগুলো তাঁর নিজের বক্তব্য ও অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সাহসী দৃশ্যের জন্যই কি আটকে গিয়েছিল অভিনয়জীবন?
মল্লিকার ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার আসে, ‘মার্ডার’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে তিনি যে বিপুল পরিচিতি পেয়েছিলেন, সেই পরিচিতিই কি পরে তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল?
মল্লিকার নিজের বক্তব্যে এর কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মল্লিকার দাবি, সাহসী দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি তাঁর কাজের সুযোগকে প্রভাবিত করেছে। কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাননি বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগতভাবে আপস করতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে কাজ হারাতে হয়েছে।
তবে মল্লিকার ক্যারিয়ারকে শুধু এই একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ছবির নির্বাচন, চরিত্রের ধরন, বাণিজ্যিক সাফল্য এবং দীর্ঘ বিরতিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অভিনীত ‘ওয়েলকাম’, ‘ডাবল ধামাল’, ‘হিসস’ ও ‘পলিটিকস অব লাভ’-এর মতো ছবির দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু ঘনিষ্ঠ দৃশ্যনির্ভর ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। কমেডি থেকে ফ্যান্টাসি, আন্তর্জাতিক প্রযোজনা থেকে মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা, বিভিন্ন ধরনের কাজে অংশ নিয়েছেন।
তবু ‘মার্ডার’-এর সাফল্যে তৈরি হওয়া পরিচিতি এতটাই প্রবল ছিল যে অন্য চরিত্রে অভিনয় করলেও তাঁকে প্রায়ই সেই ছবির অভিনেত্রী হিসেবেই মনে করা হয়েছে।
বলিউড ছাড়িয়ে হলিউড, জ্যাকি চ্যানের সঙ্গে অভিনয়

বলিউডে পরিচিতি পাওয়ার পর মল্লিকা ভারতের বাইরেও নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করেছেন। ২০০৫ সালে জ্যাকি চ্যানের সঙ্গে চীনা ছবি ‘দ্য মিথ’-এ অভিনয় করেন তিনি। আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এটি ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
এরপর কমেডি ছবি ‘ওয়েলকাম’-এ অভিনয় করে মূলধারার বলিউড দর্শকের কাছেও নিজের উপস্থিতি জানান দেন। ছবিটিতে অক্ষয় কুমার, অনিল কাপুর ও নানা পাটেকরের মতো জনপ্রিয় তারকারা ছিলেন। ২০১১ সালে ‘ডাবল ধামাল’-এও অভিনয় করেন তিনি।
কমল হাসানের সঙ্গে ‘দশাবতারম’ ছবিতে দেখা গেছে মল্লিকাকে। ২০১০ সালের ‘হিসস’ ছবিতে নাগিনের চরিত্রে অভিনয় করেন। হলিউডের রোমান্টিক কমেডি ‘পলিটিকস অব লাভ’-এও যুক্ত ছিলেন তিনি।
কেন ভারত ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন?
মল্লিকা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস করছেন। তবে তিনি পুরোপুরি ভারত ছেড়ে দিয়েছেন, এমনটি বলা ঠিক হবে না। তাঁর জীবন ও কাজের সূত্রে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং মুম্বাই—দুই জায়গার সঙ্গেই যোগাযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে সময় ভাগ করে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নারীদের নিজের মতো করে জীবনযাপনের সুযোগের প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ভারতের সামাজিক রক্ষণশীলতা নিয়ে হতাশার কথাও বলেছিলেন তিনি।
প্রেমের সম্পর্ক ভেঙেছে, বিয়ে নিয়ে তাড়া নেই
মল্লিকার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বহু বছর ধরে কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে ফরাসি ব্যবসায়ী সিরিল অক্সেনফাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে একসময় সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়েছিল।
২০২৪ সালের নভেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে মল্লিকা নিশ্চিত করেন, তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে গেছে এবং তিনি তখন একা ছিলেন। সম্পর্কের বিস্তারিত নিয়ে কথা বলতে চাননি তিনি। বিয়ে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে জানান, বিয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে তাঁর কঠোর অবস্থান নেই; বিষয়টি নির্ভর করে দুজন মানুষের ইচ্ছার ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে মল্লিকা আরও বলেছেন, প্রেম খুঁজে বেড়ানোর মতো কোনো তাড়া তাঁর নেই। নিজের জীবন নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট; একজন সঙ্গী না থাকলেই যে জীবনে শূন্যতা তৈরি হবে, এমনটি তিনি মনে করেন না। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে নিজের পছন্দ, স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিতে চান তিনি।
২০২৬ সালে নতুন করে আলোচনায় ‘দ্য ট্রেইটর্স’
দীর্ঘদিন বড় পর্দায় নিয়মিত দেখা না গেলেও মল্লিকা পুরোপুরি কাজ থেকে দূরে ছিলেন না। ২০২৪ সালে রাজ শান্ডিল্য পরিচালিত ‘ভিকি বিদ্যা কা ও ওয়ালা ভিডিও’ ছবির মধ্য দিয়ে বলিউডে ফেরেন তিনি। ছবিটিতে ছিলেন রাজকুমার রাও ও তৃপ্তি দিমরি।
এরপর ২০২৬ সালে মল্লিকার আলোচনায় ফেরার বড় উপলক্ষ রিয়েলিটি শো ‘দ্য ট্রেইটর্স’-এর দ্বিতীয় মৌসুম। করণ জোহর সঞ্চালিত এই অনুষ্ঠানে প্রতিযোগীদের মধ্যে কে বিশ্বস্ত আর কে বিশ্বাসঘাতক, তা নিয়ে চলে কৌশল, সন্দেহ ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। বৈচিত্র্যময় প্রতিযোগীদের সঙ্গে মল্লিকার অংশগ্রহণ তাঁর পরিচিত অভিনয়জগতের বাইরের একটি দিক তুলে ধরেছে।
তবে সব রিয়েলিটি শোতে অংশ নিতে আগ্রহী নন মল্লিকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘বিগ বস ২০’-এ অংশ নেওয়ার গুঞ্জন নাকচ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ওই অনুষ্ঠানের ধরন তাঁর পছন্দ নয়। বরং ভ্রমণ, অভিযান, খাবার কিংবা মানুষের সঙ্গে কথোপকথনভিত্তিক অনুষ্ঠান তাঁকে বেশি আকর্ষণ করে।

বয়স নিয়ে অস্বস্তি নেই, বোটক্সও চান না
বিনোদনজগতে বয়স বাড়ার সঙ্গে অভিনেত্রীদের চেহারা নিয়ে আলোচনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। মল্লিকা এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বোটক্স বা ফিলারের সাহায্যে চিরকাল ২৫ বছর বয়সী দেখানোর ইচ্ছা তাঁর নেই। তাঁর দাবি, তিনি এসব প্রসাধনী–পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেননি এবং ভবিষ্যতেও করতে চান না।
গ্ল্যামারের বাইরে অভিনয় করতে চান মল্লিকা
গত সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে মল্লিকা বলেছেন, তাঁর সাহসী ও গ্ল্যামারাস ভাবমূর্তি অনেক সময় অভিনয়শিল্পী হিসেবে তাঁর অন্য দিকগুলোকে আড়াল করেছে। তাঁর ধারণা, এই পরিচিতির কারণে সব ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তিনি যথেষ্ট পাননি।
এখন কমেডি চরিত্রে আরও বেশি কাজ করতে চান মল্লিকা। নিজের কমেডি করার দক্ষতা নিয়েও আশাবাদী তিনি। একই সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোনো ব্যক্তিত্বকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভারতীয় মহাকাশচারী কল্পনা চাওলার জীবনীভিত্তিক ছবিতে অভিনয় করতে চান তিনি।
হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
