দেশে আসা প্রবাসী আয়ের অর্ধেকেরও বেশি ঢাকা বিভাগের। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশে প্রায় ৮৫৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগ পেয়েছে প্রায় ৪৪৮ কোটি ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৫২ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে কম ৯ কোটি ডলারের মতো রেমিট্যান্স এসেছে রংপুর বিভাগে, যা মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ১ শতাংশ। শুধু বিভাগভিত্তিক হিসাবেই নয়, জেলাভিত্তিক হিসাবেও রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। আর সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স আনছে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটি জেলা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অনেক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি নিয়মিত দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। তবে একভাবে বিভাগ ও জেলায় রেমিট্যান্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভাগ ও জেলাভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহে এমন বড় ব্যবধানের পেছনে প্রবাসে কর্মরত মানুষের সংখ্যা, তাদের আয়ের পরিমাণ এবং দেশে অর্থ পাঠানোর স্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ঢাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যাংকিং কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এ বিভাগে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের মতো কয়েকটি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবণতা
থাকায় এসব জেলাতেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য। তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কম হলেই কোনো জেলা থেকে বিদেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা কম, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ, প্রবাসীরা যে জেলায় অর্থ পাঠান, ব্যাংকের হিসাবে সেই জেলাতেই রেমিট্যান্স যুক্ত হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, জেলাভিত্তিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ নির্ভর করে প্রবাসীদের বসবাস, তাদের পরিবারের অবস্থান ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর। অনেক জেলার প্রবাসীদের পরিবারের সদস্য ঢাকায় বসবাস করেন। তারা ঢাকার ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করায় রেমিট্যান্সের পরিমাণও ঢাকায় বেশি দেখা যায়। তাই কোনো জেলায় রেমিট্যান্স বেশি এলেই সেখানকার মানুষ বেশি বিদেশে কাজ করেন, বিষয়টি এমন নয়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে ৮৫৯ কোটি ২৫ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে এসেছে ৪৪৮ কোটি ৪২ লাখ ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগের পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম। এ বিভাগে তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২২৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এসেছে ৭৬ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। অন্যদিকে খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে রেমিট্যান্স এসেছে তুলনামূলক কম।
একক জেলা হিসেবেও শীর্ষে ঢাকা : বিভাগের পাশাপাশি একক জেলা হিসেবেও প্রবাসী আয় পাওয়ার ক্ষেত্রে সবার উপরে রয়েছে ঢাকা। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ জেলায় রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৩ কোটি ১৯ লাখ ডলার, যা দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এসেছে শুধু ঢাকা জেলায়। ঢাকা জেলার রেমিট্যান্সের সঙ্গে অন্য জেলাগুলোর ব্যবধানও উল্লেখযোগ্য। তিন মাসে ঢাকায় যে পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে, তা চট্টগ্রাম জেলার তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। আর কুমিল্লার তুলনায় ঢাকায় রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ছয় গুণ বেশি। তিন মাসে চট্টগ্রাম জেলায় জেলায় রেমিট্যান্স এসেছে ৫৯ কোটি ৮১ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে কুমিল্লা, যেখানে এসেছে ৫৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। নোয়াখালী জেলায় ২৬ কোটি ৬৩ লাখ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৩ কোটি ৪৩ লাখ, ফেনীতে ২১ কোটি ২৯ লাখ এবং চাঁদপুরে ১৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও রাঙামাটি জেলায় : জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে পঞ্চগড় জেলায়। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ জেলায় প্রবাসী আয় এসেছে মাত্র ৪১ লাখ ডলার। লালমনিরহাটে এসেছে ৪৯ লাখ এবং রাঙামাটিতে ৫০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৯ লাখ, খাগড়াছড়িতে ৮৪ লাখ এবং শেরপুরে ১ কোটি ৪ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলাতেও প্রবাসী আয়ের পরিমাণ কম। কুড়িগ্রামে তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার, নীলফামারীতে ১ কোটি ৩০ লাখ এবং দিনাজপুরে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অন্যদিকে রংপুর জেলায় এসেছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে রংপুর বিভাগের আট জেলায় তিন মাসে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৯ কোটি ৮ লাখ ডলার।
অন্য বিভাগগুলোর রেমিট্যান্সের চিত্র : ঢাকার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এ বিভাগের ১১ জেলায় তিন মাসে মোট ২২৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় এসেছে যথাক্রমে ৫৯ কোটি ৮১ লাখ ও ৫৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। নোয়াখালীতে ২৬ কোটি ৬৩ লাখ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৩ কোটি ৪৩ লাখ এবং ফেনীতে ২১ কোটি ২৯ লাখ ডলার এসেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৭৬ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে সিলেট জেলায় এসেছে ৪২ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। মৌলভীবাজারে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ, হবিগঞ্জে ১০ কোটি ৬৫ লাখ এবং সুনামগঞ্জে ৯ কোটি ৫৮ লাখ ডলার এসেছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩৬ কোটি ১৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে যশোরে এসেছে ৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার। কুষ্টিয়ায় ৪ কোটি ৯৪ লাখ, খুলনায় ৪ কোটি ৮৬ লাখ এবং ঝিনাইদহে ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২৯ কোটি ৪ লাখ ডলার। এর মধ্যে বগুড়ায় ৫ কোটি ৭৫ লাখ, পাবনায় ৫ কোটি ১৭ লাখ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ডলার এসেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ৩ কোটি ৭৫ লাখ, রাজশাহীতে ৩ কোটি ৪৭ লাখ এবং নওগাঁয় ৩ কোটি ৪২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় তিন মাসে মোট ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় এসেছে ৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। পিরোজপুরে ২ কোটি ৫৫ লাখ, পটুয়াখালীতে ১ কোটি ৬২ লাখ এবং বরগুনায় ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার এসেছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় এসেছে ৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। জামালপুরে ৪ কোটি ২৮ লাখ, নেত্রকোনায় ১ কোটি ৬৮ লাখ এবং শেরপুরে ১ কোটি ৪ লাখ ডলার এসেছে।
