টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারেনি মার্কেন্টাইল ব্যাংক। একই সময়ে ব্যাংকের টাকায় বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ রয়েছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসানের বিরুদ্ধে। চার দেশে তাঁর সফরের পেছনে ব্যাংকের খরচ হয়েছে ৩৪ লাখ টাকারও বেশি।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সফরটি বাতিল হয়। বাতিল সফরের খরচসহ মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১০ শতাংশ বা তার বেশি ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) পেয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ ছিল ২০১৭ সালে। ২০২৩ সালে ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংকটিতে গত দুই বছর নিট মুনাফা হয়নি। তবে প্রভিশনের আগে পরিচালন মুনাফা ২০২৩ সালে ছিল ৫০৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে ৫২৭ দশমিক ২২ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালে ৫৪৫ দশমিক ৪০ কোটি টাকা।
আমিরাত থেকে যুক্তরাজ্য, কোন সফরে কত খরচ
আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মতিউল হাসান ২০১৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে যোগ দেন। এমডি হওয়ার আগে তিনি প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এএমডি) দায়িত্ব পালন করেছেন।
মতিউল হাসান মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের নভেম্বরে। এরপর ২০২৫ সালের মে থেকে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য সফর করেছেন। ব্যাংকের লেনদেন বিবরণীতে এসব সফরের চারটি খরচ এবং বাতিল হওয়া সিঙ্গাপুর সফরের খরচ দেখানো হয়েছে।
গত বছর মতিউল হাসানের সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে খরচ হয় ৬ লাখ ১০ হাজার ৪৫০ টাকা। একই বছর অস্ট্রেলিয়া সফরে খরচ দেখানো হয় ১১ লাখ ৬২ হাজার ৪৫৮ টাকা।
চলতি বছরের থাইল্যান্ড সফর ছিল চিকিৎসার জন্য। এ সফরে খরচ হয় ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯১ টাকা। এক্সিকিউটিভ ট্রেনিংয়ের জন্য যুক্তরাজ্য সফরের খরচ দেখানো হয় ১১ লাখ ১ হাজার ৯৯০ টাকা। চার সফরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ ছিল অস্ট্রেলিয়ায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ যুক্তরাজ্যে। এ ছাড়া বাতিল হওয়া সিঙ্গাপুর সফরের পেছনে ব্যাংকের খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৩ টাকা।
যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে অফিস আদেশে বলা হয়, মতিউল হাসান ২০২৬ সালের ২৬ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের বাইরে থাকবেন। এ সময় তিনি সোনালী বাংলাদেশ লিমিটেডের আয়োজনে যুক্তরাজ্যে ‘এক্সিকিউটিভ ট্রেনিং প্রোগ্রামে’ অংশ নেবেন। তাঁর অবর্তমানে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (সিআরও) মো. জাকির হোসাইন এমডির দায়িত্ব পালন করেন। অফিস আদেশ অনুযায়ী সফরের মেয়াদ ছিল ২৬ জুন থেকে ৪ জুলাই, অর্থাৎ নয় দিন।
মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ হাউজ (ইউকে) লি.-এর পর্ষদ সভার কার্যবিবরণীতেও মতিউল হাসানের যুক্তরাজ্য সফরের উল্লেখ আছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম আমানুল্লাহ, পরিচালক এ এস এম ফিরোজ আলম এবং পরিচালক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডি মতিউল হাসানের সৌজন্য সফর অনুমোদন করা হয়। কার্যবিবরণীতে বলা হয়, সফরটি ব্যাংক বোর্ডের অনুমোদনের পর সুবিধাজনক সময়ে হবে। অর্থাৎ সফরটি পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসাপেক্ষ ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত পরিচালনা পর্ষদ ওই সফরের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
ঋণ সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সিআরও ও এএমডি থাকাকালে মতিউল হাসান ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুটি ঋণ সুপারিশ মেমোতে স্বাক্ষর করেন। দুটিই ছিল টাইম লোনের সুপারিশ। টাইম লোন হলো নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিশোধের শর্তে দেওয়া ঋণ।
একটি মেমো ছিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বেতন-বোনাস পরিশোধে ডিএসএল গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪ কোটি টাকার টাইম লোনের সুপারিশ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ডেনিম প্রসেসিং প্ল্যান্ট, জেডএ সোয়েটার্স, জেডএ অ্যাপারেলস এবং ওয়ে মার্ট অ্যাপারেলস। অন্যটি ছিল টিআরজেড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য ১০ কোটি টাকার টাইম লোনের সুপারিশ। দুটিই ৯ শতাংশ সুদে ছয় মাসের জন্য।
মতিউল হাসানের পাশাপাশি দুই মেমোতেই প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুস্তাহিদুর রেজা চৌধুরী, আরএমজি মনিটরিং সেলের প্রধান কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান শামীম আহমেদ এবং তৎকালীন এমডি ও সিইও মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী স্বাক্ষর করেন।
টিআরজেডের মেমোতে আরএমজি মনিটরিং সেলের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গ্রাহকের মেয়াদোত্তীর্ণ দায় ১০০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক। ২০২২ সালের ২৩ আগস্টের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী এফসি হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির নিট ঘাটতি ৭৫ কোটি টাকা। মেমোর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ক্রেডিট কমিটির সামনে রাখা হয় এবং ক্রেডিট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগ ঋণের সুপারিশ করে।
বিদেশ সফরে সমস্যা দেখছেন না মতিউল হাসান
সামগ্রিক বিষয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে পাঠানো জবাবে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাশরেক ব্যাংকে বিশ্বের সব অঞ্চলের ব্যাংক আমন্ত্রিত ছিল। বাংলাদেশ থেকে টপ ১০ জন ফরেন ট্রেড এক্সপার্ট ব্যাংকার ও তৎকালীন গভর্নর আমন্ত্রিত ছিলেন। ব্যাংকের বিজনেস রিলেশনের জন্য ভিজিটের প্রয়োজন ছিল।
অস্ট্রেলিয়া সফরের বিষয়ে তিনি বলেন, মেলবোর্ন চেম্বার অ্যান্ড কমার্স রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ১০ জন আমন্ত্রিত ছিলেন। মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করি।
যুক্তরাজ্য সফরের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, সোনালী ব্যাংক ইউকে পিএলসি বাংলাদেশের স্বনামধন্য ১০টি ব্যাংকের নির্বাচিত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ব্যাংকিংয়ের ওপর চার দিনব্যাপী ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানায়। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে অংশগ্রহণ করি।
থাইল্যান্ড সফরের বিষয়ে মতিউল হাসান বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অফিসে হঠাৎ করে অচেতন হয়ে যাই। ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানোর পর বিস্তারিত ইনভেস্টিগেট করে কোনো রোগ শনাক্ত না হওয়ায় মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শক্রমে ব্যাংককে চিকিৎসার জন্য চার দিন অবস্থান করি। এমডির বাংলাদেশ ব্যাংকের চুক্তি অনুযায়ী, ডাক্তারের সুপারিশে চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে যাওয়া যায়। উপরোক্ত ঘটনায় ডাক্তারের পরামর্শেই চিকিৎসা নিই এবং ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী খরচ বহন করে।
তাঁর দাবি, তাঁর সবকটি বিদেশযাত্রা ছিল ব্যাংকের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে, যেখানে অন্যান্য ব্যাংকের এমডিরাও ছিলেন। কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। পূর্ববর্তী এমডির বিদেশ সফর যাচাই করলে দেখা যাবে, তাঁর সফরের সংখ্যা সম্পূর্ণ যৌক্তিক ছিল। তারপরও বিগত তিন মাসে ১০/১২টি ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের হাবিব আমেরিকান ব্যাংকের আমন্ত্রণে বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু মার্কেন্টাইল ব্যাংক তাতে অংশগ্রহণ করেনি। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট ঠিক রাখার জন্য ফরেন ভিজিট খুব জরুরি।
