
স্বাস্থ্য খাতে ৭০ হাজার কোটি টাকার বাজেট, নিয়োগ দেওয়া হবে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত
হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা বাড়ানো নয়; বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে রোগ, শারীরিক অক্ষমতা ও অকালমৃত্যু প্রতিরোধ নিশ্চিত করা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, “হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যর্থতা নির্দেশ করে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী, হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হাসপাতাল বৃদ্ধি নয়, বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে রোগ, শারীরিক অক্ষমতা ও অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা।”
তিনি বলেন, প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। যাতে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীদের বারবার ঢাকায় ছুটতে না হয়। ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে এ ধরনের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও চিকিৎসা উপকরণের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ তুলে ধরে ড. এম এ মুহিত বলেন, সরকারের প্রথম বাজেটে হার্টের রিং বা স্টেন্ট, ডায়ালিসিস ফিল্টার, সক্রিয় ওষুধ উপাদান (এপিআই) এবং কৃত্রিম চোখের লেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো বা মওকুফ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি ও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমানোর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে যেসব কমিটির বৈঠক দুই বছরেও হতো না, গত পাঁচ মাসে সেসব কমিটির একটি তিনবার বৈঠক করে চিকিৎসাসামগ্রীর অনুমোদন নিশ্চিত করেছে। এতে চিকিৎসা প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা দ্রুত কাটিয়ে ওঠার অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি করলেই হবে না; এসব যন্ত্রপাতির জীবনকালীন ব্যয়, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং স্থানীয় প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ লক্ষ্যে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের চিকিৎসা প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা, দেশে চিকিৎসা যন্ত্রাংশ সংযোজন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি অকেজো হয়ে পড়ে থাকা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে জাতীয় ই-হেলথ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. এম এ মুহিত সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন, অ্যামচ্যামের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক কাউন্সেলর পল জি ফ্রস্ট এবং মেডট্রনিক পিএলসি ও ইন্টেল করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. ওমর ইশরাক।
এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠী, জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ও ডিরেক্টর মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (রোমেল), বেকটন ডিকিনসনের বাংলাদেশ বিজনেস লিডার মির্জা সজীব রায়হান এবং অ্যামচ্যাম হেলথকেয়ার সাবকমিটির ইনচার্জ ডিরেক্টর ও ন্যাটকো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-মামুন এম রাসেল।
আলোচনায় দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জামের সহজলভ্যতা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
