‘হলুদ বাঁটো মেন্দি বাঁটো বাঁটো ফুলের মৌ’ বিলুপ্ত এসব গান
আধুনিক ব্লেন্ডার মেশিনের সুবাদে আজকের যুগের সিলেটের নারীরা ভুলে গেছেন শিলপাটা (পাটা-ফুতাইল) এর ব্যবহার। প্যাকেটজাত গুড়া মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, বাখর, গরম মশলা এখন মেশিনের দ্বারা ভাঙিয়ে প্রচুর পরিমাণে প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়।
কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো
আধুনিক ব্লেন্ডার মেশিনের সুবাদে আজকের যুগের সিলেটের নারীরা ভুলে গেছেন শিলপাটা (পাটা-ফুতাইল) এর ব্যবহার। প্যাকেটজাত গুড়া মরিচ, হলুদ, ধনিয়া, বাখর, গরম মশলা এখন মেশিনের দ্বারা ভাঙিয়ে প্রচুর পরিমাণে প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়। আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগেও সিলেটের গৃহবধুরা পাটা-ফুতাইল ব্যবহার করে মরিচ, হলুদ, পেয়াজ কিংবা রসুন এবং আদা পিষতেন। কিন্তু এখনকার ডিজিটাল যুগের গৃহবধু কিংবা তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী মশলা বাটার সরঞ্জাম এর নাম বলতেই পারবে না। সিলেটের প্রাকৃতিকন্যা নামে খ্যাত জাফলং এর দক্ষ কারিগররা শিলপাটা পাথর কেটে কেটে তৈরী করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি করতেন, আয়ও হতো আশানুরুপ। এসব শিল্পে ধস নামায় বেকার হয়ে পড়েছেন হাজারো কারিগর, অনেকে অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন। সরকারও এই ঐতিহ্য ধরে রাখার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা অনেকেই এই ঐতিহ্যই ভুলে গেছি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিলপাটা। গ্রাম বাংলার মানুষের বাড়িতে হলুদ, মরিচ, আদা, রসুন ও নানা রকমের ভর্তা বানাতে ব্যবহার হতো শিল পাথরের পাটা। এককালে ঘরে ঘরে শিলপাটা ছিল রান্নার মসলা বাটার অন্যতম উপায়। প্রতিটি পরিবারে শিলপাটার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। কিন্তু কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বাঙালী সমাজ ব্যবস্থার পারিবারিক অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শিলপাটার ব্যবহার। তবে এখন শিল-পাটার বিকল্প হিসেবে এযুগের মানুষ ব্যবহার করছে বিভিন্ন আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী। কেননা এ যুগের মানুষ আধুনিকতায় ঝুঁকে পড়েছে। শিলপাটা দিয়ে বেটে খাওয়ার চাইতে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী দিয়ে সেসব জিনিস করে খাওয়া খুব সহজ।
বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে হলুদ বাঁটো, মেন্দি বাঁটো, বাঁটো ফুলের মৌ, বিয়ের সাঁজন সাঁজবে কন্যা... এইসব গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে গ্রামের সকল শ্রেণি পেশার নারীরা বিয়ে বাড়িতে দু-তিন দিন আগে থেকে শিলপাটা দিয়ে হলুদ, মেহেদি বাটতেন। তাছাড়া সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভোজনবিলাসী গৃহিণীরা নানা রকম স্বাদের মসলা বেটে দিতেন। গ্রাম বাংলায় এখনও অনেক ভোজনবিলাসী পরিবার আছে যারা শিলপাটায় বাটা মসলা ছাড়া রান্না খেতে পছন্দ করেন না। গ্রাম বাংলায় শিলপাটা নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। গুড়া মসলা বাজারে সহজলভ্যতা ও বাণিজ্যিকভাবে প্রচলন হওয়ায় পাথরের শিল-পাটায় মসলা পেষার গুরুত্ব একেবারেই হ্রাস পেয়েছে। গৃহিণীরাও পরিশ্রম থেকে রেহাই পেতে প্যাকেটজাত মসলার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের ফুলবিবি নামে ৮০ বছরের এক প্রবীন গৃহিণী বলেন, “আগের দিনে গ্রামাঞ্চলের মানুষ শিলপাটা বিভিন্ন ধরণের খাদ্য তৈরির কাজে ব্যবহার করতো। শিলপাটায় পেষা কাঁচামরিচ ও শুটকি মাছ ও কালোজিরার ভর্তার স্বাদ আজও অতুলনীয়। পাটায় পেষা মসলার রান্নার ঘ্রাণ, স্বাদ মেশিনে গুঁড়ো করা মসলার চেয়ে অনেক বেশি। তাই তারা এখনো শিলপাটায় পিষেই রান্নার মসলা তৈরি করেন।”
শুধু এ কারণেই একটু কষ্টসাধ্য হলেও গ্রামের অনেকেই শিলপাটার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সময়ের প্রবাহে পাড়া-মহল্লার প্রতিটা দোকানে মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াসহ নানা প্যাকেটজাত মসলায় বাজার ভরে আছে। হাত বাড়ালেই সব মসলার গুড়া পাওয়া যাচ্ছে।
একসময় দেশের জেলা শহরগুলো ও আশপাশের এলাকায় প্রতিনিয়ত দেখা মিলতো শিল-পাটা খোদাইকারীর। কাঁধে শিলপাটা বয়ে নিয়ে খোদাইকারীরা বাড়ির সামনে গিয়ে ডেকে উঠতো- 'পাটা খোদাইবেন, ডেকছির কান্দা লাগাইবেন' এখন আর সেই হাকডাকের দৃশ্য চোখে পড়েনা। শোনা যায় না বাড়ির আঙ্গিনায় শিল-পাটা খোদাই করার টুকটাক শব্দ। শিলপাটার ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক কারিগর পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
