প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরশে নোবিপ্রবির নীলদীঘি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ১০১ একর ক্যাম্পাসের চিরচেনা এক নিঝুম ঠিকানা ‘নীলদীঘি’। মূলত এটি ঘাট বাঁধানো একটি পুকুর হলেও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় পরিচিতি পেয়েছে দীঘি হিসেবে। একাডেমিক ভবন-৩ ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে অবস্থিত এই জলাধারটি যেন ক্যাম্পাসের এক নীলাভ স্বস্তির কেন্দ্র। চারপাশে নারিকেলগাছের সারি ও সবুজ গাছপালা মৃদু বাতাসে শান্ত পরিবেশ তৈরি করে।
ক্লাস, পরীক্ষা আর গবেষণাগারের ব্যস্ততা শেষে শিক্ষার্থীরা একটু স্বস্তির খোঁজে ছুটে আসেন নীলদীঘির পারে। দলীয় আলোচনা, পাঠচক্র ও সাংগঠনিক বৈঠকের জন্য এটি এক জনপ্রিয় স্থান। সকালে পরিবেশ শান্ত থাকলেও বিকেলে জমে ওঠে তরুণদের প্রাণবন্ত আড্ডা। বাতাসে সুরের মূর্ছনা, দূর থেকে আসা পাখিদের কিচিরমিচির আর প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঘাটগুলো হয়ে ওঠে মুখরিত। রাতে জোছনার আলোয় বন্ধুদের নৈশ আড্ডারও সাক্ষী এই দীঘি।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নীলদীঘির রূপেও আসে নতুনত্ব। গ্রীষ্মের দাবদাহে শিক্ষার্থীদের সাঁতার কাটার আনন্দ কিংবা শীতে ছোটখাটো বারবিকিউ উৎসব– সবখানেই রয়েছে নীলদীঘির ছোঁয়া। শুধু শিক্ষার্থীরা নন, অবসর সময়ে ক্যাম্পাসের শিক্ষক ও কর্মকর্তারাও আসেন এই দীঘির স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে।
নোবিপ্রবির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে এই জলাধার। হাজারো শিক্ষার্থীর স্মৃতি, আড্ডা আর স্বপ্নের গল্প বুকে ধারণ করে নীলদীঘি প্রতিনিয়ত নতুন প্রাণ যোগ করছে ক্যাম্পাসজীবনে।
আরও পড়ুন
পঞ্চম বছরে পাবিপ্রবি প্রেস ক্লাব
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->ক্লাস শেষ হয়েছে। কেউ ফিরছেন হলে, কেউ ছুটছেন বাস ধরতে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত। এরই মধ্যে কারও ফোনে আসে একটি কল– ‘ক্যাম্পাসে একটি ঘটনা ঘটেছে, একটু দেখবেন?’ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তখন ছুটতে হয় ক্যাম্পাসের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। কখনো কোনো অনুষ্ঠান, কখনো শিক্ষার্থীদের দাবি, কখনো সাফল্যের গল্প– এসব খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত সময় কাটে তাদের। তারা পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ক্যাম্পাস সাংবাদিক।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব। চার বছর পেরিয়ে সংগঠনটি এখন পঞ্চম বছরে। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা ঘটনা, অর্জন, সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন প্রেস ক্লাবের সদস্যরা।
দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করছেন সংগঠনটির সদস্যরা। তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট-বড় নানা ঘটনা পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাঠকের কাছে। তবে একটি সংবাদ প্রকাশের পেছনে সাংবাদিকদের যে পরিশ্রম থাকে, তা অনেক সময় পাঠকের অজানা থেকে যায়।
সংবাদ তৈরির জন্য প্রথমে যেতে হয় ঘটনাস্থলে। কথা বলতে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে। কখনো শিক্ষার্থী, কখনো শিক্ষক, কখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিতে হয়। এর পর তথ্য যাচাই, ছবি সংগ্রহ, প্রতিবেদন লেখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংবাদ পাঠানোর কাজ চলে। এসবের পাশাপাশি সামলাতে হয় ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা।
সব খবর অবশ্য আনন্দের নয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে। এসব বিষয় তুলে ধরতে প্রয়োজন হয় সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা ও তথ্যের যথার্থতা। পাবিপ্রবি প্রেস ক্লাবের সদস্যরা এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন।
নতুন সদস্যদের জন্য প্রেসক্লাবটি সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠ নেওয়ারও একটি ক্ষেত্র। প্রথম সংবাদ লেখার সময় শব্দ নির্বাচন, তথ্য উপস্থাপন কিংবা প্রতিবেদন সাজানো নিয়ে দ্বিধা তৈরি হতে পারে। অভিজ্ঞদের পরামর্শ, নিয়মিত অনুশীলন এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সেই দক্ষতা গড়ে ওঠে।
সদস্যদের দক্ষতা বাড়াতে সংবাদ ও ফিচার লেখা, ভিডিও সম্পাদনা, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং ফটোসাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে চর্চায় উৎসাহ দেওয়া হয়। পাশাপাশি শিক্ষা সফর, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক আয়োজন সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও দলগত কাজের মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
সাংবাদিকতা কেবল খবর পরিবেশনের কাজ নয়, এটি জনস্বার্থে তথ্য তুলে ধরার দায়িত্বও। তাই প্রশংসনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সমস্যা ও অনিয়মের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা প্রয়োজন। তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
চার বছরের পথচলা শেষে পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে পাবিপ্রবি প্রেসক্লাব। সামনে সংগঠনটির চ্যালেঞ্জ হবে সাংবাদিকতার পেশাগত মান বজায় রাখা, সদস্যদের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাপ্রবাহ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা। কারণ, ক্যাম্পাসের প্রতিটি ঘটনা শুধু সংবাদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা।
আরও পড়ুন
রয়্যাল বেঙ্গলের রাজ্যে রহস্যময় যাত্রা
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->তখন অক্টোবরের আগমনী বার্তা। সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে চোখেমুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে একদল তরুণ-তরুণী জড়ো হয়েছেন হাদি চত্বরে। পরস্পরের গল্প, আড্ডা, কত শত পরিকল্পনা আর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি– সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। অন্যদিকে, কয়েকজনের কাঁধে ক্যামেরাসহ দায়িত্বের বিশাল ভার। মুহূর্তেই প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠল পরিবেশ।
ইট-পাথরের শহরের কোলাহল ছেড়ে সমুদ্রের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রহস্যময় অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন একদল তরুণ-তরুণী। বলছিলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের বার্ষিক শিক্ষা সফরে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল সুন্দরবন ভ্রমণের গল্প।
৩০ সেপ্টেম্বর রাত ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বাস নিয়ে আমরা রওনা হলাম খুলনা বিআইডব্লিউটিএর ৪ নম্বর ঘাটের উদ্দেশে। সেখানে ট্যুর এজেন্সির তত্ত্বাবধানে ‘এমভি দ্য সেইলর’-এ উঠে পড়লাম সবাই। রাত ১১টায় রূপসা নদীর বুক চিরে শুরু হলো আমাদের যাত্রা। প্রথম গন্তব্য হাড়বাড়িয়া। গভীর রাতে চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতা মাখা নদীর পানি যেন সোনার মতো চকচক করছিল। চারপাশের নীরবতা আর নদীর বুকে জাহাজের এগিয়ে চলা আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতার দিকে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জাহাজ পৌঁছে গেল হাড়বাড়িয়ায়।
ভোরের আলো ফুটতেই জাহাজ থেকে নৌকায় করে পৌঁছালাম হাড়বাড়িয়ায়। যাওয়ার পথে অনেক ছোট ছোট নৌকায় জেলেদের মাছ ধরতে দেখলাম। তাদের জীবনসংগ্রাম দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম আমরা। বন বিভাগের এক সশস্ত্র বন-কর্মকর্তার নিরাপত্তায় আমরা বনের ভেতর হাঁটতে শুরু করলাম। দুই পাশে সুন্দরী, গোলপাতা ও বাইনসহ নানা প্রজাতির গাছ। প্রায় এক মাইলের পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম পদ্মপুকুরে। এটি হাড়বাড়িয়ার একমাত্র মিঠাপানির পুকুর, যেখানে বন্য প্রাণীরা পানি পান করতে আসে। পথে দেখা মিলল হরিণ ও বানরের। হাড়বাড়িয়া ভ্রমণ শেষে জাহাজে ফিরে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। তবে বিশ্রামের ফাঁকেও অপেক্ষা করছিল নতুন রোমাঞ্চ। পরবর্তী গন্তব্য কোকিলমনি ও তিনকোনা দ্বীপ।
দুপুর ২টায় আমাদের জাহাজ কোকিলমনিতে নোঙর করল। সেখানে দল বেঁধে ঘাস খেতে থাকা হরিণের পাল দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। কিছু স্মৃতি ক্যামেরায় বন্দি করে রওনা দিলাম তিনকোনা দ্বীপের দিকে। বিকেলের শেষ ভাগে দ্বীপটির কাছাকাছি পৌঁছালাম। জাহাজ থেকে দেখলাম অসংখ্য সামুদ্রিক ঈগল, উড়ন্ত শঙ্খচিল আর হরিণের পাল। পাখিদের ওড়াউড়িতে তিনকোনা দ্বীপের চারপাশ হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত। দ্বীপের চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে নেমে এল সন্ধ্যা। সেদিন রাতে জাহাজে অনুষ্ঠিত হলো মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
পরদিন ভোরে পৌঁছে গেলাম কটকায়। ছোট ট্রলারে করে রওনা দিলাম কটকা অভয়ারণ্যের উদ্দেশে। বনের ভেতর বন্য হরিণের এত কাছাকাছি আসার সুযোগ পেলাম এই প্রথম। সৈকতের মনোরম পরিবেশ ও সাগরের বাতাসে মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম ট্রলারের কাছে। দুপুরের খাবার শেষে সুন্দরবনের সরু খাল ধরে শুরু হলো খালভ্রমণ। বাঘের দেখা না মিললেও বানর, হরিণ ও গুইসাপের দেখা পেলাম। খালভ্রমণ শেষে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছালাম জামতলা সমুদ্রসৈকতে। পড়ন্ত বিকেলে সৈকতের শান্ত সৌন্দর্য ভ্রমণে যোগ করল নতুন মাত্রা। সন্ধ্যায় ফিরে রাতের বারবিকিউ পার্টি উপভোগ করলাম।
তৃতীয় দিন কচিখালী হয়ে টাইগার পয়েন্টের ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশের প্রকৃতি উপভোগ করলাম। দুপুরের পর আমাদের গন্তব্য ডিমের চর। চরে পা ফেলার পরই মনের মধ্যে অন্য রকম রোমাঞ্চ কাজ করল। ঘন কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করে ও স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কেটে কাটিয়ে দিলাম দারুণ কিছু মুহূর্ত। চতুর্থ দিন সকালে পৌঁছে গেলাম আন্ধারমানিকে। সুন্দরবনের এই অংশটি ঘুরে দেখে দুপুরের খাবার শেষে রওনা দিলাম শেষ গন্তব্য করমজলের উদ্দেশে। করমজলের কুমির প্রজননকেন্দ্র ঘুরে দেখার পর শুরু হলো ফেরার পালা।
সুন্দরবনের সবুজ, নদীর জল ও বন্যপ্রাণীর বিচরণকে পেছনে ফেলে জাহাজ খুলনার উদ্দেশে রওনা হলো। চার দিনের এই ভ্রমণে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হলো অনেক নতুন স্মৃতি। রাত ৯টার দিকে খুলনার ৪ নম্বর ঘাটে পৌঁছে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ফিরলাম। রূপসার বুকে চাঁদের আলো, হরিণের পাল আর জাহাজের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা– সব মিলিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণ আমাদের কাছে ক্যাম্পাসজীবনের ব্যস্ততার বাইরে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কারের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
আরও পড়ুন
হেমন্তের ভোরে শীতের পদধ্বনি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->ভোরের আকাশ তখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। চারপাশে ছড়িয়ে আছে স্নিগ্ধ নীরবতা। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু আর দূরের হালকা কুয়াশা জানান দিচ্ছে আবহাওয়া পরিবর্তনের কথা। জানালার ফাঁক গলে আসা বাতাসে অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীতলতা। অথচ দিনের বেলা রোদের উষ্ণতা বলে দেয়, শীত আসতে এখনো কিছুটা দেরি। প্রকৃতির এই পরিবর্তন যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশে পৌষ ও মাঘ এই দুই মাস শীতকাল হলেও হেমন্তের শেষভাগে এর উপস্থিতি স্পষ্ট হতে থাকে। গ্রামের সবুজ প্রান্তরে এখন সোনালি ফসলের সমারোহ। কোথাও চলছে ধান কাটা, কোথাও উঠানে নতুন ফসল তোলার ব্যস্ততা। বাতাসে ভেসে আসছে নতুন ধানের ঘ্রাণ। একই সঙ্গে শীতের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে গ্রামে গ্রামে। গাছিরা খেজুরগাছ প্রস্তুত করছেন, আর ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে পিঠাপুলির প্রতীক্ষা।
শহর কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ঋতুবদলের এই চিত্র দৃশ্যমান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ভোরের কুয়াশা, গাছের পাতায় জমা শিশির আর শান্ত পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনে আনে প্রশান্তি। দিনের বেলার উজ্জ্বল রোদ আর ভোরের মৃদু শীতলতার এই বৈপরীত্যই হেমন্তের মূল সৌন্দর্য।
তবে শীতের আগমন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য একই রকম আনন্দ বয়ে আনে না। শীতের প্রকোপ বাড়লে নিম্নআয়ের ও ছিন্নমূল মানুষের জীবনে কষ্ট নেমে আসে। পর্যাপ্ত গরম কাপড়ের অভাবে রাতে তাদের ভোগান্তি বাড়ে। তাই শীত পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। হেমন্তের দিন গড়াচ্ছে। শীত এখনো পূর্ণ রূপ নেয়নি, তবে হিমেল হাওয়া ও ভোরের কুয়াশায় মিশে আছে তার আগমনী গান। এখন অপেক্ষা কেবল সেই চেনা শীতের ভোরের।
আরও পড়ুন
শিক্ষার্থীদের ভাবনায় শিক্ষার সংকট
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা, সনদ অর্জনের প্রতিযোগিতা, কর্মমুখী দক্ষতার ঘাটতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এসব সংকট শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান।
ক্ষয়িষ্ণু শিক্ষাব্যবস্থা ও সংকটাপন্ন প্রজন্ম
মো. আব্দুল্লাহ আল নোমান
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বর্তমান যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার চেয়ে সনদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, স্বাধীন চিন্তা ও গবেষণার আগ্রহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও তথ্যপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। অংশগ্রহণমূলক পাঠদান, সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা এবং কার্যকর পরামর্শদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
শিক্ষার চেয়ে সনদের গুরুত্ব বেশি
কানিজ ফাতেমা
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম সংকট হলো জ্ঞানের চেয়ে সনদ অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। পরীক্ষার ফল ও জিপিএর প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির বিকাশ অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের মতো ব্যবহারিক যোগ্যতার ঘাটতি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনীহা, অতিরিক্ত কোচিংনির্ভরতা, ব্যবহারিক ক্লাসের অভাব এবং গবেষণায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য রয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাকে আনন্দদায়ক ও প্রয়োগমুখী করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা জরুরি।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন
সঞ্চিতা অধিকারী সোমা
বাংলা বিভাগ
জাতীয় সমৃদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষার মান, অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, সেশনজট, গবেষণার সীমিত সুযোগ, নকলের প্রবণতা এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যিকভাবে দেখার মানসিকতা শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তক ও অবকাঠামোর মান উন্নত করা প্রয়োজন। অ্যাসাইনমেন্ট, দলগত কাজ ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। শিক্ষায় পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ এবং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে বৈষম্যহীন ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞানার্জন
ওবাইদুল্লাহ আল মাহবুব
আইন বিভাগ
বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও শিক্ষার্থীরা যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তা হলে শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ফলে মুখস্থবিদ্যার চর্চা বাড়লেও বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার বিকাশ প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। এ ছাড়া শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার ও প্রযুক্তিসুবিধার অভাব রয়েছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেক তরুণ প্রয়োজনীয় কম্পিউটার দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ঘাটতির কারণে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতি বদলাতে পরীক্ষায় বিশ্লেষণ, ব্যবহারিক কাজ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি প্রযুক্তি, ভাষা ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার সাফল্য শুধু পাসের হার বা সনদের সংখ্যায় নয়; শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
শিক্ষার্থীদের এসব মতামতে একটি বিষয় স্পষ্ট–শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হলে সনদ ও পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।
