দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় থামছেই না এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু সংক্রমণের গতি। দিন যত যাচ্ছে, ততই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নতুন নতুন আক্রান্ত রোগী।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে সংক্রমণের পাশাপাশি কাজ, শিক্ষা বা অন্যান্য প্রয়োজনে খুলনা ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত ব্যক্তিরা আক্রান্ত হয়ে নিজ জেলায় ফিরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে জেলায় সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গু সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১০ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লীনিকে ভর্তি হয়েছেন ২ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগী: সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: ৫ জন কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩ জন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল: ১ জন দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১ জন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক: ২ জন ভর্তি হয়েছে।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলায় মোট ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪১ জনে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৬৮ জন।
তবে শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা ও খুলনার বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে ২০ জন রোগীকে। এখন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে ১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ জন ভর্তি রয়েছেন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ১২ জন দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৭ জন।
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক: ৫ জন সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল: ৪ জন কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩ জন শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: ৩ জন এদিকে জেলার আশাশুনি ও তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে নতুন বা পুরোনো কোনো ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন নেই বলে জানিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
অপরদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের একটি বড় অংশ মূলত পার্শ্ববর্তী জেলা খুলনা কিংবা রাজধানী ঢাকায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কর্মসংস্থান বা পড়াশোনার সূত্রে সেখানে অবস্থানকালে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তারা চিকিৎসার জন্য নিজ জেলা সাতক্ষীরায় ফিরে আসছেন।
সম্প্রতি খুলনায় মেয়ের বাড়িতে থাকা এক গৃহবধূ টানা ছয় দিন তীব্র জ্বরে ভোগার পর সাতক্ষীরায় ফিরে পরীক্ষা করালে তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একইভাবে, ঢাকায় কর্মরত এক ব্যক্তির ছেলেও সেখানে এডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে সাতক্ষীরায় ফিরে এসে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। এ ধরনের বহিরাগত সংক্রমণের কারণে জেলায় মোট শনাক্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
হাসপাতালগুলোর সার্বিক চিকিৎসাসেবা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মো. আব্দুস সালাম জানান, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক শয্যার সুব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত আছে এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ডেঙ্গু এনএস-১ (NS1) সহ অন্যান্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা ২৪ ঘণ্টা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে ডেঙ্গুর মহামারি আকার ধারণ করা রোধে সাধারণ মানুষকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সিভিল সার্জন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জরুরি নির্দেশনাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জমে থাকা পানি অপসারণ: ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, ফুলদানি, টব কিংবা বাসাবাড়ির ছাদে তিন দিনের বেশি জমে থাকা পানি অবিলম্বে ফেলে দিতে হবে।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা: বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল চত্বরসহ চারপাশের পরিবেশ নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার: এডিস মশা সাধারণত দিনে বা হালকা আলোতে বেশি কামড়ায়। তাই রাতে শোয়ার পাশাপাশি দিনের বেলায় ঘুমানোর সময়ও মশারি বা মশারির বিকল্প (যেমন: মস্কিটো রিপেলেন্ট/ক্রিম) ব্যবহার করা আবশ্যক।
লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করা: জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, মাথা ব্যথা বা ডেঙ্গুর কোনো প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলে ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবেবলে তিনি জানান।
এদিকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল সাতক্ষীরায় ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
