ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে বৌদ্ধ ভাবাদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের বিট প্রজন্মের কবি অ্যালেন গিন্সবার্গকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন ১৯৯১ সালের মার্চে তাঁকে লালন সাঁইয়ের গানের একটি সংকলন উপহার দেন। সেটি ছিল বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত এবং আবু রুশদ মতিনউদ্দীন-অনূদিত সংস অব লালন। সেটি উল্টেপাল্টে গিন্সবার্গ বলেন, ‘এমন বই–ই তো খুঁজছিলাম।’ তাঁর মুগ্ধতা কত দূর অব্দি পৌঁছেছিল এর সাক্ষ্য ঠিক এক বছর পরে ১৯৯২ সালের ৩১ মার্চে, লালনের মরমি ভাবনায় নিষিক্ত এবং শৈলীতে রচিত এই কবিতাগুলো।
১.
সত্য বটে ফেঁসে গেছি
ভবের বন্ধনে
যৌবনে সাবধান করে
দিয়েছিলেন ব্লেক
পরে আরও এলেন কত গুরু:
তুমি বরং তৈরি থাকো আসছে মরণ
জড়িয়ে পোড়ো না দৌলতের
জটাজালে
আমার যখন যৌবন,
আমাকে সতর্ক করা হলো
এখন আমি প্রবীণ নাগরিক
আর মজে আছি লাখো
বইয়ে
লাখো চিন্তায় লাখো
ডলারে লাখো
ভালোবাসায়
কীভাবে যাই এই দেহটি ছেড়ে?
অ্যালেন গিন্সবার্গ বলে, আমি
পড়ে গেছি বিষম ফাঁপরে
২.
বসেছিলাম আশেকের
পায়ের কাছে
আর সে আমাকে বলল সবকিছু
ফোটো, এক্ষুনি কেটে পড়ো
পাছা সামলাও
কদম দ্যাখো
ব্যায়াম করো, ধ্যানে বসো, ভাবো
নিজের মেজাজ নিয়ে—
এখন আমি বুড়ো মানুষ
বাঁচব না আর
২০টা বছর পরের
২০ সপ্তাও হয়তো নয়,
পরের মুহূর্তেই হয়তো আমাকে
নেওয়া হবে
পুনর্জন্মে
কেঁচোর খামারে, হয়তো এটা
ঘটেই গেছে—
কী করেই–বা জানি, বলে
অ্যালেন গিন্সবার্গ
হয়তো আমি খোয়াবেই আছি
তামাম সময়—
৩.
এখন রাত ২টা আর উঠতে হবে
সকাল সকাল
আর মনোবাঞ্ছা পুরাতে ট্যাক্সিতে ছুটব
২০ মাইল—
আমি ফেঁসে গেলাম কী করে
এই কাজ–পাগল শো–বিজের
ধ্যানের বাজারে?
যদি আমার আত্মা থেকে থাকে
বিকিয়ে দিয়েছি মিষ্টি কথার বিনিময়ে
যদি শরীর থেকে থাকে অন্তর ফতুর করে
নিকেশ করেছি
যদি মন থেকে থাকে
প্রেম তার কবর দিয়েছে
যদি রুহ থেকে থাকে ভুলে গেছি
নিশ্বাস নিতে নিতে
যদি ভাষা থেকে থাকে তার
সবটাই ছিল দম্ভ
যদি বাসনা থেকে থাকে বেরিয়ে
গেছে পায়ু দিয়ে
যদি বাঞ্ছা থেকে থাকে
মুক্তির
কী করে চলে এলাম
কোঁচকানো এই লোকটার ভেতরে?
মিষ্টি কথা, প্রেমভাব,
দম্ভের নিশ্বাস, পায়ুর
বাসনা, সেরা সব অপরাধ নিয়ে?
কী যে এক জগাখিচুড়ি আমি, অ্যালেন গিন্সবার্গ।
৪.
জেগে থাকি ঘুমহীন আর
মৃত্যুর কথা ভাবি
—নিশ্চয়ই এটা খুবই কাছে
যখন ছিলাম দশ বছরের
তার চেয়ে
আর অবাক লাগে দুনিয়া ছিল
কত্ত বড়—
যদি না জিরাই আমি জলদি মরে যাব
যদি ঘুমিয়ে কাটাই তবে নির্বাণের
সুযোগ হারাব—
ঘুম আর জাগা, অ্যালেন
গিন্সবার্গ মধ্যরাতে
বিছানার ওপরে।
৫.
ভোর ৪টা
তারপর ওরা এল আমার খোঁজে,
আমি লুকিয়ে ছিলাম পায়খানার ঘরে
ওরা ভেঙে ফেলল পায়খানার দরজা
আমি পড়ে গেলাম নিরীহ এক কিশোরের ওপর
আহ্ কাঠের দরজা পড়ল
নিরীহ এক বালকের ওপর!
আমি বাটির ওপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলাম,
লুকিয়ে ফেললাম আমার ছায়া,
ওরা আরেকজনকে হাতকড়া পরিয়ে
আমার বদলে
নিয়ে গেল হিঁচড়ে—এভাবে আর
কত কাল পার পেয়ে যাব?
শিগগিরই ওরা বুঝে যাবে
আমি ওখানে নাই
ওরা ফের আসবে আমার খোঁজে, কোথায়
আমি লুকাব আমার দেহ?
আমি কি আমি নাকি অন্য কেউ
নাকি কেউ না?
এই ভারী মাংসপুঞ্জ এই
দুর্বল হৃৎপিণ্ড এই ফুটো কিডনি তবে কে?
কে তবে কারাবন্দী
৬৫ বছর ধরে
এই লাশের ভেতরে? আমার পাশে থেকে
কার হলো চরম পুলক?
এবার লাগল ভাটার টান,
যা কিছু পেলাম তার ফায়দা হলো কী?
তা কি সত্য হবে? আসলেই
তা সত্য হবে?
৬.
আমারও ছিল সুযোগ আর হারাল তা হেলায়,
কত কত সুযোগ আর তার
দিইনি তেমন দাম।
ও হ্যাঁ আমি মগ্ন, প্রায়
পাগল হয়ে গিয়েছিলাম ভয়ে
হারিয়েছি অমর সেই সুযোগ,
একজন তো হারিয়ে ফেলেছিল।
অ্যালেন গিন্সবার্গ সতর্ক করছে
নিয়ো না আমার পিছু
বিনাশের পথে।
