বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বগুড়া সার্কেলের অধীনে আপতকালীন জরুরি মেরামত কাজের নামে নজিরবিহীন দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। প্রায় ৭৯টি ভুয়া ও অসম্পূর্ণ প্যাকেজের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জাল কাগজপত্র ও মিথ্যা মাস্টাররোলের আড়ালে সরকারি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেতরে ও বাইরে চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করে ইতিমধ্যে দুদকের বগুড়া জেলা কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট দরপত্র ও বিলের নথিপত্র সংগ্রহ করে বিস্তারিত পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের কাছে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে। কমিশন অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করে দুর্নীতির গভীরতা বিবেচনায় একটি আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান দল গঠন করে এবং দ্রুত নথিপত্র জব্দের নির্দেশ দেয়।
অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে পাউবোর বগুড়া সার্কেলের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের এক অশুভ আঁতাতের চিত্র। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম ও নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হকসহ পওর (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) বিভাগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা সরাসরি এই অর্থ ভাগবাটোয়ারায় যুক্ত ছিলেন।
অনুসন্ধান সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নন-ডেভেলপমেন্ট রেভিনিউ (এনডিআর) কর্মসূচির আওতায় প্রকাশিত ৭৭টি গ্রুপ দরপত্রে প্রায় ১২ কোটি ৩৯ লাখ টাকার প্রাক্কল ধরা হয়। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায়। মাত্র ৮-১০ জন চিহ্নিত পকেটের ঠিকাদারকে দিয়ে এবং অন্যের লাইসেন্স ভাড়া করে নিজস্ব পছন্দের লোকদের মাঝে এসব কাজ বণ্টন করা হয়। পরবর্তীতে সরেজমিনে সামান্য কাজ করেই কিংবা কোনো ধরনের কাজ না চালিয়েই কয়েক গুণ অতিরিক্ত বিল বানিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়।
অনিয়মের এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০২৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির (এলটিএম) আওতায় ২০টি গ্রুপের বিপরীতে প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নদীর বাঁধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বন্যার বাহানা দিয়ে বগুড়ার ইছামারা ও কামালপুরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় বারবার একই স্থানে ভুয়া ‘জরুরি কাজ’ দেখানো হয়। বাস্তবে কোনো সুরক্ষা কাজ না হলেও কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বরাদ্দকৃত পুরো অর্থই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুসন্ধানে বিগত ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো ধরনের দরপত্র বা উন্মুক্ত আহ্বান ছাড়াই প্রায় ১০০ কোটি টাকার তথাকথিত জরুরি কাজের ভয়াবহ ভুয়া বিল তৈরির চাঞ্চল্যকর তথ্যও বেরিয়ে আসছে। পাউবোর ইতিহাসে এত বড় পরিমাণের অর্থ লোপাটের ঘটনা নজিরবিহীন। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংগ্রহ করা সকল নথি ও মাস্টাররোল সূক্ষ্মভাবে যাচাই-বাছাই করে দ্রুতই দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
