একদিকে ইমরান খান, অন্যদিকে জ্যাক ক্যালিস ও গ্যারি সোবার্স! টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অলরাউন্ডারদের শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনায় এই নামগুলো যেন আলাদা এক উচ্চতায়। ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা, বল হাতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া-দুই ভূমিকাতেই তারা ছিলেন অসাধারণ। সেই কিংবদন্তিদের সঙ্গে একই মঞ্চে এবার উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের নাম।!
ক্রিকেটের নামী ওয়েবসাইট ক্রিকবাজের পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে টেস্ট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকায় অষ্টম হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এটি শুধু একটি র্যাঙ্কিং নয়, বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘদিনের অর্জনের স্বীকৃতিও!
তালিকার শীর্ষে রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খান। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে জ্যাক ক্যালিস ও গ্যারি সোবার্স। এরপর রয়েছেন রবীন্দ্র জাদেজা, কিথ মিলার, ইয়ান বোথাম ও শন পোলক। তাদের পরেই সাকিবের অবস্থান। নবম স্থানে আছেন নিউজিল্যান্ডের রিচার্ড হ্যাডলি। একসময় যাদের খেলা দেখে পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটাররা অলরাউন্ডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন, তাদেরই কয়েকজনের সঙ্গে একই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক!
সাকিবের অলরাউন্ডার কোটিয়েন্ট বা এআরকিউ স্কোর ৫১.৮৫। সেখানে শীর্ষে থাকা ইমরানের স্কোর ৬৮.৪২। ক্যালিসের ৬৬.২৬ এবং সোবার্সের ৬৫.৫৭। তবে এই মূল্যায়নের বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু কত রান করেছেন কিংবা কত উইকেট নিয়েছেন, সেই হিসাব করা হয়নি। একজন ক্রিকেটার দলের জয়ে কতটা অবদান রেখেছেন, দীর্ঘ সময় ব্যাটিং ও বোলিংয়ে কতটা ধারাবাহিক ছিলেন এবং ঘরের মাঠের বাইরের পরিবেশে কেমন খেলেছেন, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় এসেছে।
আর এখানেই সাকিবের গল্পটা হয়ে উঠেছে আরও আকর্ষণীয়। সামগ্রিক তালিকায় অষ্টম হলেও দলের জয়ে অবদানের সূচকে সেরা পাঁচ অলরাউন্ডারের মধ্যে রয়েছেন তিনি। এই তালিকায় তার সঙ্গে আছেন ভিনু মানকড়, রিচার্ড হ্যাডলি, গ্যারি সোবার্স ও ইয়ান বোথাম। ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরেও দলের প্রয়োজনের সময় কতটা কার্যকর ছিলেন সাকিব, সেটির স্বীকৃতি মিলেছে এই বিশ্লেষণে।
সাকিবের টেস্ট ক্যারিয়ারও সেই দাবির পক্ষে কথা বলে। বাংলাদেশের হয়ে ৭১ টেস্টে ৪ হাজার ৬০৯ রান করেছেন তিনি। উইকেট নিয়েছেন ২৪৬টি। ব্যাট হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে নিয়মিত আঘাত হেনেছেন। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
তার ক্যারিয়ারের অন্যতম উজ্জ্বল মুহূর্ত ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খুলনা টেস্ট। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে ১৩৭ রান করার পর দুই ইনিংস মিলিয়ে নিয়েছিলেন ১০ উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি রয়েছে মাত্র তিনজনের। ইমরান খান ও ইয়ান বোথামের সঙ্গে সেই বিরল তালিকায় আছেন সাকিবও। এমন অর্জনই তাকে সাধারণ অলরাউন্ডারদের ভিড় থেকে আলাদা করেছে।
২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়েলিংটন টেস্টেও ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের বড় প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি। খেলেছিলেন ২১৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে গড়েছিলেন ৩৫৯ রানের জুটি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে পঞ্চম উইকেটে সেটিই সর্বোচ্চ জুটি। প্রতিকূল কন্ডিশনেও বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য যে তার ছিল, সেই ম্যাচ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
সাকিবের বিশেষত্ব শুধু বড় কোনো ইনিংস কিংবা এক ম্যাচে অসাধারণ বোলিং নয়। দীর্ঘ সময় ধরে দুই বিভাগে কার্যকর থাকাটাই তাকে আলাদা করেছে। ক্রিকবাজের আরেকটি পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে সেই ধারাবাহিকতার চিত্র। সর্বোচ্চ ৫০ টেস্টের ধারাবাহিক পর্বে ৩ হাজার রান ও ১৫০ উইকেটের দ্বৈত অর্জন রয়েছে মাত্র তিনজনের-গ্যারি সোবার্স, ইয়ান বোথাম ও সাকিব আল হাসান।
অবশ্য সর্বকালের সেরা নির্ধারণে বিতর্ক থাকবেই। ভিন্ন সময়ে খেলা ক্রিকেটারদের একই মাপকাঠিতে বিচার করা কঠিন। খেলার ধরন, পিচের বৈশিষ্ট্য, প্রতিপক্ষের শক্তি ও দলের সামগ্রিক সামর্থ্য-সবকিছুই একজন অলরাউন্ডারের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে। তাই এই র্যাঙ্কিংকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে একাধিক সূচকের সমন্বয়ে তৈরি এই মূল্যায়নে সাকিবের অবস্থান তার আন্তর্জাতিক মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিবের মতো প্রভাবশালী অলরাউন্ডার খুব বেশি আসেননি। দীর্ঘ সময় ধরে দলের ব্যাটিং ও বোলিং-দুই বিভাগেই তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। অনেক ম্যাচে একাই দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়েছেন, আবার কখনো ব্যাট হাতে বিপদের সময় হাল ধরেছেন। তাই ইমরান, ক্যালিস কিংবা সোবার্সের পাশে তার নাম থাকা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ পথচলারও এক উল্লেখযোগ্য অর্জন।
তালিকায় সাকিবের অবস্থান আট। কিন্তু দলের জয়ে অবদানের বিচারে সেরা পাঁচে থাকা বলে দেয়, তার গুরুত্ব কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব ক্রিকেটের কিংবদন্তিদের পাশে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারের নাম উচ্চারিত হওয়াটাই বড় প্রাপ্তি!
