বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট ‘টুয়ার্ডস আ ন্যাশনাল সার্কুলার ইকোনমি স্ট্র্যাটেজি ফর বাংলাদেশ’-এর তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক ৮ দশমিক ২১ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় অংশ সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করছে।
বিংশ শতাব্দীতে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘সস্তা শ্রম’। কিন্তু ২০২৬-পরবর্তী আধুনিক বাণিজ্যে টিকে থাকার একমাত্র হাতিয়ার হলো ‘সার্কুলার ইকোনমি’ ও সম্পদ ব্যবহারের সর্বোচ্চ দক্ষতা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬/৮ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী আগামী ২৪ নভেম্বরে বাংলাদেশের চূড়ান্ত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নির্ধারিত রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর ‘ইকোডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রডাক্টস রেগুলেশন (ইএসপিআর)’ ও কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়নের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশকে এখন সস্তা অ্যাসেম্বলি লাইন থেকে বৈশ্বিক কাঁচামালের ‘রিসোর্স রিফাইনারি হাবে’ রূপান্তর করা সময়ের দাবি।
দ্য বার্নিং প্লাটফর্ম ও গ্লোবাল ট্রেড প্রেশার
প্রথম প্রহর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামোর পরিবর্তন, ২০২৬ সালের এক মেঘলা সকালে গাজীপুরের কোনাবাড়ির এক সুতা তৈরি কারখানায় তুলা আমদানির নতুন ঋণপত্র অনুমোদন করতে গিয়ে আটকে গেলেন এক শিল্পোদ্যোক্তা। ইউরোপীয় কমিশন গৃহীত ইএসপিআর (২০২৪) রেগুলেশনের অধীনে ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে ইউরোপীয় বাজারে পণ্য পাঠাতে ‘ডিজিটাল প্রডাক্ট পাসপোর্ট’ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ পাসপোর্টের মাধ্যমে রফতানীকৃত পণ্যে কত শতাংশ রিসাইকেল্ড কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর কার্বন ফুটপ্রিন্ট কত, তা ডিজিটাল বারকোডের মাধ্যমে ট্র্যাকিং করা হবে। আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটাবে। এর ফলে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত ‘জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস’ ও ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ সুবিধা সীমিত হয়ে পড়বে। ফলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও রিসাইকেল্ড উপকরণের শর্ত পূরণ ছাড়া বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
চারটি হাইপার-স্পেসিফিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার বিশ্লেষণ
ক. টেক্সটাইল ‘ঝুট’ ক্লাস্টার: গাজীপুর-সাভার-নারায়ণগঞ্জ বেল্ট
গ্লোবাল ফ্যাশন এজেন্ডা এবং রিভার্স রিসোর্সেসের ‘সার্কুলার ফ্যাশন পার্টনারশিপ বাংলাদেশ’ রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি পোশাক কারখানা থেকে প্রতি বছর প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টন পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেক্সটাইল বর্জ্য (ঝুট) তৈরি হয়। এ ঝুটের একটি বড় অংশ আগুনে পুড়িয়ে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। অথচ প্রযুক্তির সাহায্যে শতভাগ ঝুটকে ‘পোস্ট-কনজিউমার রিসাইকেল্ড ফাইবার’-এ রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশ বছরে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁচা তুলা আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবে।
খ. মেটাল ও ই-বর্জ্য ক্লাস্টার: ধোলাইখাল-কেরানীগঞ্জ ‘আরবান মাইনিং’
পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা বার্ষিক ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। পুরান ঢাকার ধোলাইখাল, জিঞ্জিরা ও পোস্তগোলা এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক রিফাইনিং ব্যবস্থা না থাকায় মূল্যবান সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বুয়েটের রাসায়নিক তথ্য অনুযায়ী, ই-বর্জ্য সঠিকভাবে প্রসেস না হওয়ায় বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ স্বর্ণ, তামা, লিথিয়াম ও কোবাল্ট অপচয় হয়। একে প্রাতিষ্ঠানিক ‘আরবান মাইনিং’ হাবে উন্নীত করলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ও ব্যাটারি সাপ্লাই চেইনে বিরল কাঁচামাল রফতানিকারক হতে পারবে।
গ. প্লাস্টিক ও মেরিন ব্লু-ইকোনমি: চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বেল্ট
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট ‘টুয়ার্ডস আ ন্যাশনাল সার্কুলার ইকোনমি স্ট্র্যাটেজি ফর বাংলাদেশ’-এর তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক ৮ দশমিক ২১ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় অংশ সমুদ্র বাস্তুতন্ত্রকে বিপন্ন করছে। পতেঙ্গা ও কক্সবাজার উপকূলীয় প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের ‘প্লাস্টিক ক্রেডিট’ ও বিশ্ব বাণিজ্যের অফসেটিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক রফতানি খাত গড়ে তোলা সম্ভব।
ঘ. এগ্রি-বর্জ্য ক্লাস্টার: বগুড়া-যশোর বায়ো-মাস সাইকেল
বগুড়ার শেরপুর এবং যশোরের কৃষি অঞ্চলের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত হাবগুলো থেকে প্রতি বছর উৎপন্ন বিপুল এগ্রো-ওয়েস্ট পচে মিথেন ছড়ায়। এ এগ্রি-বর্জ্যকে বায়ো-মাস সলিউশন ও পেলেট জ্বালানিতে রূপান্তর করা গেলে সার্কুলার কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় ফার্টিলাইজার ও পেপার পাল্প শিল্পের কাঁচামাল তৈরি করে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব।
জাতীয় নীতিগত বাধা ও সংস্কার প্রস্তাব
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি সংস্কার, সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নে প্রধান বাধা রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান ভ্যাট কাঠামো। স্থানীয় বাজার থেকে ঝুট বা বর্জ্য সংগ্রহের সময় এনবিআর কর্তৃক ৭ দশমিক ৫ থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ধার্য রয়েছে, যা অনানুষ্ঠানিক চোরাচালানকে উৎসাহিত করে।
এক. জিরো-ভ্যাট নীতি: সার্কুলার কাঁচামাল সংগ্রহ ও প্রসেসিংয়ে অবিলম্বে ‘জিরো-ভ্যাট’ নীতি কার্যকর করতে হবে।
দুই. সার্কুলার ট্রানজিশন ফান্ড: বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স নীতি’র অধীনে গ্রিন ব্যাংকিং অর্থায়নে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে রিফাইনিং প্লান্টের জন্য বিশেষ ফান্ড চালু করতে হবে।
তিন. জাতীয় রোডম্যাপ: বাণিজ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ১০ বছর মেয়াদি সার্কুলার ইকোনমি রোডম্যাপ ২০২৬-৩৫ দ্রুত অনুমোদন করা প্রয়োজন।
‘রিসোর্স রিফাইনারি’ হিসেবে নতুন ব্র্যান্ডিং
বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল সস্তা শ্রম; কিন্তু ২০২৬-পরবর্তী বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শক্তিই হলো ‘রিসোর্স ইফিসিয়েন্সি’। বাংলাদেশকে আর কেবল পণ্যের ‘অ্যাসেম্বলি লাইন’ হিসেবে সীমিত রাখলে চলবে না। অবকাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে সার্কুলার ইকোনমিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক কাঁচামালের দক্ষ ‘রিসোর্স রিফাইনারি হাব’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহযোগী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর
অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য
দাউদ ইব্রাহিম হাসান: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; মাস্টার্স (অর্থনীতি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; প্রজেক্ট অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ
