সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ঢাকায় আটটি ফ্লাইটের প্রায় তিন হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
- কর্মস্থলে ফেরা অনিশ্চিত, ভোগান্তিতে তিন হাজার যাত্রী
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ঢাকায় আটটি ফ্লাইটের প্রায় তিন হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। গতকাল রোববার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের দুটি রয়েছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা সূচি পরিবর্তন ও ভ্রমণসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মুখে আছেন।
ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট রয়েছে। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) অনিবার্য পরিচালনগত কারণ দেখিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ দুটি ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল বিমান। যাত্রীদের বিমানবন্দরে না যাওয়ার অনুরোধও জানানো হয়। বিমান জানায়, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় ফ্লাইটের সময়সূচি পুনর্ন্ধািরণ করা হচ্ছে। পরিবর্তিত সময়সূচি ও ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে যাত্রীদের পরবর্তী আপডেটের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
জানা গেছে, যাত্রীদের কেউ বাসে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবহনে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এখানে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেলে তাদের আবার নতুন করে যাত্রার পরিকল্পনা করতে হয়। অধিকাংশ প্রবাসীই সৌদির ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট কেটে এসেছেন। তারা জানেন না কীভাবে তাদের টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করে কবে সৌদিতে ফিরবেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেকেই চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন, ভুগছেন অতিরিক্ত যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ এবং পরিবারের কাছে ফেরার অনিশ্চয়তায়।
গতকাল রোববার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায়, রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব প্রবাসীর অনেকেই জানেন না, কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাদের চোখেমুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। বিদেশে কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার আশঙ্কার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপ।
বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদ প্রবাসী শাহ আলম বলেন, রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। দেশের বাড়ি কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শরীফ উদ্দিনেরও যাওয়ার কথা সৌদি আরবের রিয়াদে। ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছেন তিনি। মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না, মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট কেটেও যেতে পারব কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এর আগে, শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের মিসাইল হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশী ছাড়াও মিশর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা রয়েছেন। হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে এ নিয়ে অন্তত চারবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক পাইলটসহ তিন সৌদির নাগরিক নিহত হন।
নিন্দা ও ক্ষোভ ধর্মমন্ত্রীর : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্বরোচিত হামলায় বাংলাদেশি নাগরিকসহ প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক, উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)।
গতকাল রোববার ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে জানানো হয়, এ হামলায় ভুক্তভোগী উমরাহ কাফেলার জিম্মাদার মোহাম্মদ আলী কাশেমীর সঙ্গে কথা বলেছেন ধর্মমন্ত্রী এবং আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। পাশাপাশি, আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা, সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ধর্মমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আবেগের স্থান। এদেশেই অবস্থিত পবিত্র কাবা শরিফ আল্লাহর ঘর এবং মদিনা মুনাওয়ারায় রয়েছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক। সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা মুসলিম বিশ্ব কখনোই মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। বাংলাদেশও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। পবিত্র ভূমিতে আগত আল্লাহর মেহমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরীহ মানুষ ও উমরাহযাত্রীদের জীবন বিপন্ন করে এমন কোনো সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ধর্মমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক ও উমরাহযাত্রীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আবাসন এবং নির্বিঘ্নে পবিত্র মক্কা ও মদিনায় যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। যাতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক অনাকাক্সিক্ষত ভোগান্তির শিকার না হন এবং সবাই নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের উমরাহ পালন শেষে দেশে ফিরতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ও সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে।
ধর্মমন্ত্রী বলেন, আল্লাহর মেহমানদের ওপর হামলা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। আমরা এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে বাংলাদেশ সরকার দৃঢ়ভাবে রয়েছে। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে।
তিনি আরও বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৌদি আরবে অবস্থানরত অন্য বাংলাদেশি নাগরিক ও উমরাহযাত্রীদের সার্বিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ধর্মমন্ত্রী উমরাহযাত্রীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা, নিরাপদ আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সৌদি আরব সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের পাশে থাকবে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
