ঢাকা, ১২ অক্টোবর – ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে টাকা চাওয়া আর ‘যৌতুক দাবি’ কি এক বিষয়? নাকি দুটোর মধ্যে স্পষ্ট আইনি পার্থক্য রয়েছে? সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে এই আইনি সীমানাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা চাওয়ায় স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলাকে ‘সাজানো ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে নিম্ন আদালতের দেওয়া দুই বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। একই সাথে আসামি মো. রাসেল উদ্দিনকে সব অভিযোগ থেকে পুরোপুরি খালাস দেওয়া হয়েছে।
গত রোববার (১১ অক্টোবর ২০২৬) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সেলিমের একক বেঞ্চ এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: বিয়ে থেকে কারাদণ্ড
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম আইন অনুযায়ী কক্সবাজারের মো. রাসেল উদ্দিন ও ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় সাড়ে তিন বছর পর, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট কক্সবাজার শহরের একটি ভাড়া বাসায় অপ্রীতিকর ঘটনার অভিযোগ এনে স্বামীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন স্ত্রী।
স্ত্রীর অভিযোগ: স্বামী ব্যবসার জন্য তার কাছে ১ লাখ টাকা চান। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়।
নিম্ন আদালতের রায়: এই মামলার বিচার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
পরবর্তীতে ওই রায়ের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেন দণ্ডপ্রাপ্ত রাসেল উদ্দিন।
হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ
আপিলের শুনানিতে মামলার নথিপত্র, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও চিকিৎসা প্রতিবেদন গভীর পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দুটি প্রধান কারণে নিম্ন আদালতের দণ্ড বাতিল করেন:
যৌতুক দাবির অভিযোগ:| স্বামী ব্যবসার কাজের কথা বলে টাকা চেয়েছিলেন। ব্যবসার জন্য অর্থ চাওয়া বিয়ের শর্ত বা বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে চাওয়া অর্থ নয়। ফলে এটি ‘যৌতুক’ হিসেবে আইনগতভাবে প্রমাণিত নয়।
নির্যাতনের অভিযোগ: বাদী জবানবন্দিতে ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাতের কথা বলেন। অন্যদিকে, ডাক্তার ও মেডিকেল সনদে বাঁ কাঁধে আঘাতের উল্লেখ ছিল। | মৌখিক সাক্ষ্য ও চিকিৎসা নথির মধ্যে সরাসরি বৈপরীত্য ও অসংগতি রয়েছে, যা নির্যাতনের অভিযোগকে সন্দেহের মুখে ফেলে। |
আইনের সংজ্ঞা নিয়ে আদালতের মন্তব্য: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় যৌতুকের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা টেনে হাইকোর্ট বলেন—শুধু টাকা চাওয়ার ঘটনা দিয়ে সেটিকে যৌতুক দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অর্থ দাবির উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এই রায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক।
অনেক সময়ই পারিবারিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত মনোমালিন্যের জেরে যৌতুক ও নির্যাতন দমন আইনের মতো কঠোর ধারার অপব্যবহার করার অভিযোগ ওঠে। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে—
১. স্বামী-স্ত্রীর সাধারণ আর্থিক লেনদেন বা ব্যবসার তাগিদে টাকা চাওয়াকে ঢালাওভাবে ‘যৌতুক’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে না।
২. যৌতুকের অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে বিয়ের শর্ত বা বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিনিময়ে অর্থ চাওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে।
৩. চিকিৎসকের প্রতিবেদন (মেডিকেল সনদ) এবং বাদীর বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে কোনো নাগরিককে অন্যায়ভাবে দণ্ড দেওয়া যাবে না।
হাইকোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে একদিকে যেমন নিরপরাধ স্বামী রাসেল উদ্দিন আইনি ন্যায়বিচার পেলেন, অন্যদিকে মিথ্যা ও সাজানো মামলার মাধ্যমে আইনকে হাতিয়ার করার অপচেষ্টাও আইনি বাধার মুখে পড়ল।
এনএন/ ১২ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::স্ত্রীর কাছে টাকা চাইলেই কি তা যৌতুক? হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে সাজানো মামলা থেকে খালাস পেলেন স্বামী first appeared on DesheBideshe.