স্বপ্নের নাম ইউরোপ। কারো কাছে এটি দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশা, কারো কাছে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিশ্রুতি, আবার কারো কাছে ভাগ্য বদলে দেওয়ার এক নতুন দিগন্ত। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণ উন্নত জীবন, ভালো বেতন এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় ইউরোপে কাজ করতে যেতে চান। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ কতটা সহজ, কোন ভিসায় যাওয়া সম্ভব এবং কীভাবে প্রতারণা এড়িয়ে বৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমানো যায়Ñ তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, কৃষিশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী, ড্রাইভার ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কাজের সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোন দেশে কোন পেশায় কর্মী নেওয়া হচ্ছে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার, নিয়োগকর্তার চাহিদা এবং অভিবাসননীতির ওপর। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ইউরোপে বৈধভাবে কাজ করতে সাধারণত সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী চাকরির প্রস্তাব, ওয়ার্ক পারমিট এবং কাজের ভিসার প্রয়োজন হয়। কিছু দেশে মৌসুমি কৃষিকাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কর্মী নেওয়া হয়। আবার দক্ষ কর্মী ও উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্যও বিভিন্ন ধরনের ভিসার ব্যবস্থা রয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী কেউ কেউ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঊট ইষঁব
ঈধৎফ-এর মতো কর্মসূচির সুযোগ পেতে পারেন। তবে প্রতিটি দেশের নিয়ম আলাদা এবং আবেদন করলেই ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য আগ্রহীরা সরকারি ঙাবৎংবধং ঊসঢ়ষড়ুসবহঃ চষধঃভড়ৎস (ঙঊচ)-এর ওয়েবসাইট যঃঃঢ়ং://িি.িড়বঢ়.মড়া.নফ/ থেকে নিবন্ধন ও নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (ওয়েবসাইট যঃঃঢ়ং://নসবঃ.মড়া.নফ/) থেকেও প্রশিক্ষণ, বিদেশগমন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা এবং ভাষাজ্ঞান মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এরপর উপযুক্ত দেশের চাকরির বিজ্ঞপ্তি খুঁজে নিয়োগকর্তার পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, বেতন, কর্মঘণ্টা, আবাসন এবং চাকরির চুক্তি যাচাই করতে হবে। কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করলে সেটির অনুমোদনও পরীক্ষা করা জরুরি।
তবে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণার ঘটনাও ঘটে। কিছু অসাধু ব্যক্তি নিশ্চিত ভিসা, অল্প সময়ে বিদেশ পাঠানো কিংবা কোনো যোগ্যতা ছাড়াই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ দাবি করেন। যাচাই না করে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া, ঋণ নিয়ে অনিশ্চিত পথে যাত্রা করা কিংবা জাল কাগজপত্র তৈরিতে রাজি হওয়া বিপজ্জনক। চাকরির লিখিত প্রস্তাব, বৈধ অনুমোদন এবং অর্থ লেনদেনের রসিদ নিশ্চিত না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
দ্রুত ইউরোপ পৌঁছানোর আশায় অবৈধ পথে যাত্রা করলে ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সমুদ্রে নৌকাডুবি, মানবপাচার, অপহরণ, নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায় এবং সীমান্তে আটক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইউরোপে পৌঁছানোর পরও বৈধ কাজের অনুমতি না থাকলে চাকরি, বাসস্থান ও শ্রমিকের অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরিস্থিতি ও দেশের আইন অনুযায়ী দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসার শর্ত, মোট খরচ, চাকরির চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। সরকারি সহায়তার জন্য প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের ১৬১৩৫ নম্বরে যোগাযোগ করা যেতে পারে। ইউরোপের দেশভিত্তিক কাজ ও বসবাসের অনুমতির নিয়ম জানতে ইউরোপীয় কমিশনের ঊট ওসসরমৎধঃরড়হ চড়ৎঃধষ ব্যবহার করা যায় : যঃঃঢ়ং:// যড়সব-ধভভধরৎং.বপ.বঁৎড়ঢ়ধ.বঁ/ ঢ়ড়ষরপরবং/ সরমৎধঃরড়হ-ধহফ-ধংুষঁস/বঁ-রসসরমৎধঃরড়হ-ঢ়ড়ৎঃধষথবহ।
ইউরোপে কাজ করতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশির জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, দক্ষতা, ধৈর্য এবং বৈধ পথে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা। কারণ বিদেশে পৌঁছানোই সাফল্যের শেষ কথা নয়; সম্মানের সঙ্গে কাজ করা, ন্যায্য মজুরি পাওয়া এবং পরিবারের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই প্রকৃত অর্জন। স্বপ্ন থাকুক ইউরোপকে ঘিরে, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে প্রতিটি পদক্ষেপ হোক সচেতন, নিরাপদ ও আইনসম্মত।
