কেউ তার নাম দিয়েছেন দুঃখিনী বর্ণমালা। কেউ বলেছেন—শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী। যার মমতাময়ী প্রতিটি উচ্চারণে আজও যেন ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে।
৭৪ বছর আগে রক্ত দিয়ে কেনা বাংলা ভাষার অস্তিত্বজুড়েই আছে একুশের চেতনা। সেই চেতনাকে ধারণ করেই ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আয়োজিত হয় অমর একুশে বইমেলা। অথচ এবার সেই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন শুরু হচ্ছে ৭ জানুয়ারি, চলবে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তাই প্রশ্ন উঠছে, ভাষার জন্য আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত এই মেলার সময়সূচি নির্ধারণে একুশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
ঠিক কী কারণে এই সিদ্ধান্ত—তা জানতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ও সচিব ড. মো. সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, বিতর্ক তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কার অজুহাত দেখিয়ে কথা বলতে রাজি হননি তারা।
তবে মেলার সময় পরিবর্তনের পেছনে প্রকাশকদের আর্থিক হিসাবের কথা সামনে এসেছে। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি—বাপুস জানিয়েছে, রমজানে বই বিক্রি কম হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে জানুয়ারিতে মেলা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়ে বাংলা একাডেমিকে চিঠি দিয়েছিল তারা। অর্থাৎ, কেবল প্রকাশকদের আর্থিক লাভ-লোকসানের হিসাব এবার মেলার সময় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এ বিষয়ে বাপুসের পরিচালক মো. আবুল বাশার ফিরোজ জানান, ‘রমজান মাসে এই চাপের মধ্যে মেলা আয়োজন করা ভালো হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতারের আয়োজন থাকে। এর এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টা পরই আবার তারাবির আয়োজন থাকে। ওই সময়টিই আমাদের ব্যস্ততম সময় বা পিক আওয়ার। একুশের চেতনার কথা বলার জন্য এই সময় ঠিক আছে। তবে মেলাটি কিছুটা এগিয়ে আনলে খুব বেশি ব্যত্যয় ঘটবে বলে আমার মনে হয় না।’
১৯৭২ সালে শুরু হওয়া এই বইমেলা ক্রমে পরিণত হয়েছে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীকে। তাই ফেব্রুয়ারি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তকে নিছক সময়সূচির পরিবর্তন হিসেবে দেখতে নারাজ অনেক লেখক। তাঁদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মেলার ঐতিহাসিক তাৎপর্যই উপেক্ষিত হচ্ছে।
তবে কবি চঞ্চল আশরাফ জানান, একুশের চেতনা কোনো করুণার বিষয় নয়। একটা বইমেলা দিলাম, যখন তখন দিতে পারলাম, বিষয়টা এমন নয়। যেমন, আমাদের পয়লা বৈশাখকে আপনি যেকোনো দিনে ফেলতে পারবেন? পারবেন না। একুশে বইমেলা আমাদের সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের একটি অংশ।
প্রকাশকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ যেমন বাস্তবতা, তেমনি সত্য এই মেলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এই দুইয়ের মুখোমুখি অবস্থানে বাণিজ্যিক বাস্তবতার কাছে ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে ভাষা আন্দোলনের আবেগ ও চেতনা।
