সতবিন্দর এবং হরজিৎ: ভারতকে না জানিয়েই যাদের শিরচ্ছেদ করে সউদী
-
খবরপত্র ডেস্ক: - আপডেট সময় ০৮:৫৪:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
সউদী আরবে বিচারিক প্রক্রিয়ার কঠোরতা এবং আগাম কূটনৈতিক বার্তার অনুপস্থিতি দেশটির সমালোচকদের মাঝে অনেক সময়ই চরম বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১৯ সালে পাঞ্জাবের দুই তরুণ সতবিন্দর কুমার ও হরজিৎ সিং-এর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমইএ) জন্য ছিল তেমনই এক বড় ধাক্কা। ভারতের কোনো কূটনৈতিক দফতর বা দূতাবাসকে কোনো প্রকার পূর্বাভাস না জানিয়েই তাদের শিরচ্ছেদ করা হয়। শুধু তা-ই নয়, ভারত সরকার ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ এবং সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো সত্ত্বেও সউদী আইনি বিধিনিষেধের কারণে শেষ পর্যন্ত নিহতদের মরদেহ স্বদেশে ফিরিয়ে আনাও সম্ভব হয়নি।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার তৎকালীন এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের পাঞ্জাবের হোশিয়ারপুর জেলার বাসিন্দা সতবিন্দর কুমার এবং লুধিয়ানার বাসিন্দা হরজিৎ সিং কাজের খোঁজে সউদী আরবে গিয়েছিন। সেখানে লুণ্ঠিত অর্থের ভাগবাটোয়ারা ও বন্টন নিয়ে নিজেদের মধ্যেই আক্রোশ ও বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডা থেকে মারামারির সূচনা হলে তারা আরিফ ইমামউদ্দিন নামের তাদেরই এক ভারতীয় সহকর্মীকে হত্যা করেন।
ঘটনার কিছুদিন পর, মদপান এবং প্রকাশ্যে মারামারির অভিযোগে তারা স্থানীয় সউদী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। প্রাথমিকভাবে পুলিশি তদন্তের সময় তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের (ডির্পোটেশন) আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলছিল। তবে তদন্ত এগোলে এবং প্রাথমিক তথ্যাদি যাচাইয়ের পর বেরিয়ে আসে যে, কিছুদিন আগের আলোচিত আরিফ ইমামউদ্দিন হত্যাকাণ্ডের সাথে এই দুজনই সরাসরি জড়িত ছিলেন। ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর সউদী পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।
গ্রেপ্তারের পর সতবিন্দর ও হরজিৎকে বিচারের মুখোমুখী করতে রিয়াদের কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বিচার চলাকালীন তারা আদালতের সমক্ষে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেন।
প্রতিবেদন মতে, ২০১৭ সালের ৩১ মে অনুষ্ঠিত আদালতের শুনানিতে ভারতীয় দূতাবাসের একজন প্রতিনিধি স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন। ওই শুনানি চলাকালীন মামলাটিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়; সউদী প্রসিকিউশন কেবল সাধারণ হত্যার অভিযোগই নয়, বরং তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ‘হিরাবাহ’ (মহাসড়কে ডাকাতি বা সশস্ত্র ছিনতাই, যা সউদী আইনে সরাসরি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য গুরুতর অপরাধ) অভিযোগ যুক্ত করে এবং মামলাটি আপিল আদালতে স্থানান্তর করে। এর পর থেকে সউদী আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে পুরো প্রক্রিয়া এগোতে থাকে।
না জানিয়েই শিরচ্ছেদ ও যেভাবে দেড় মাস পর জানতে পরে ভারত
টাইমস ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার আপডেট জানার জন্য ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিয়মিত কারাগারে যাতায়াত করলেও চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দিনটির বিষয়ে তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সউদী কর্তৃপক্ষ কাউকে কোনো আগাম তথ্য বা নোটিশ না দিয়েই সতবিন্দর কুমার ও হরজিৎ সিংয়ের মৃত্যুদণ্ড (শিরচ্ছেদ) কার্যকর করে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নিহতদের পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছায়নি। স্বামী কোথায় আছেন ও তার কী পরিণতি হয়েছে—সে সম্পর্কে তথ্য পেতে সতবিন্দরের স্ত্রী সীমা রানি আদালতে একটি পিটিশন দায়ের করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে একটি জবাব পান, যেখানে বলা হয় ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর তাকে ওই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার বিভাগের তৎকালীন পরিচালক প্রকাশ চাঁদ স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে সীমা রানির পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, সতবিন্দর ও হরজিৎকে ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও স্ত্রী সীমা রানির আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রায় দেড় মাস পর ১৭ এপ্রিল খবর প্রকাশিত হয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে।
চেষ্টা সত্ত্বেও কেন লাশ আনতে পারেনি দিল্লি?
প্রতিবেদন মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রিয়াদস্থ ভারতীয় দূতাবাস নিহত দুই প্রবাসীর মরদেহ স্বদেশে ফিরিয়ে আনতে সউদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে বারবার যোগাযোগ করে এবং কূটনৈক কূটনৈতিক আবেদন পেশ করে। তবে ভারতের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় সউদী আরবের কঠোর অভ্যন্তরীণ আইন ও প্রবিধানের কারণে।
প্রথমত; সউদী আরবের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা ও দণ্ডবিধির নিয়মানুযায়ী সউদী আরবে যেসব অপরাধের শাস্তিস্বরূপ মৃত্যুদণ্ড বা শিরচ্ছেদ কার্যকর করা হয়, বিশেষ করে হত্যা বা ‘হিরাবাহ’ (ডাকাতি/সহিংস অপরাধ)-এর মতো মামলাগুলোতে অপরাধীর মৃতদেহ তাদের স্বদেশের কোনো দূতাবাস বা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার আইনত কোনো বিধান নেই। দ্বিতীয়ত; সউদী সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় এবং স্থানীয় ধর্মীয় বিধান মেনে সউদী আরবেই নির্দিষ্ট স্থানে দাফন করা হয়।
সেসময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে— সউদী আইনি কাঠামোর চরম বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের কাছে বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও নিহত সতবিন্দর কুমার ও হরজিৎ সিংয়ের মরদেহ ভারতে ফেরত আনা কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার পর সউদীতে ভারতীয় প্রবাসী স্বজনদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে পুরো ভারতে ব্যাপক সমালোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ‘বর্বরোচিত ও অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন তৎকালীন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং; তিনি একে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানান।
ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ
