কমিশন বৃদ্ধি, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে পরবর্তীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য গ্যাস বিক্রি বন্ধের আল্টিমেটাম দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা, যা দেশে চলমান জ্বালানি খাতে অস্থিরতা আরো বাড়াবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, হাজারীবাগ ও রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ধর্মঘটের ঘোষণার সুযোগ নিয়ে বাজারে শুরু হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। এক শ্রেণির অসাধু আমদানিকারক ও ডিস্ট্রিবিউটরের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুত এবং খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম আদায়ের কারণে সাধারণ ভোক্তারা সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
জানা গেছে, বাজারে এলপিজির কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই। বিগত আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। আমদানি প্রায় একই থাকা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে কয়েকটি প্রধান আমদানিকারক কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মূলত নতুন ও বর্ধিত মূল্যে বিক্রির আশায় হাজার হাজার টন গ্যাস অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।
তবে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করেছে আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। গত ১ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি দাবি করে, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘সন্তোষজনক’ এবং চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ সন্তোষজনক হওয়ায় বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও যদি কোনো অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করেন কিংবা বেআইনিভাবে মজুত গড়ে তোলেন, তবে তা প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু সরকারি এই নির্দেশনা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তব চিত্রে দেশের কোথাও এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বাজারে খুচরা বাজারে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডার ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, আমদানিকারক কোম্পানিগুলোই বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখছে এবং চালানে প্রকৃত দাম উল্লেখ করছে না। ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে লোকসান এড়াতে তারা সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকে বাড়তি টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. সেলিম খান বলেন, “বিইআরসি নির্ধারিত কমিশনের হার বর্তমানে অত্যন্ত অপ্রতুল। ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পরিবহন খরচ, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ ধরে যে কমিশন দেওয়া হয়, তাতে ব্যবসায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তদুপরি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা ও প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। মূলত এই পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার কারণেই আমরা ১৫ ও ১৬ অক্টোবর বন্ধের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিলে আমরা ধর্মঘটের পথ থেকে সরে আসব।”
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সাজিদুর রহমান দুই দিন এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধদের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এমনিতেই বাজার থেকে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, তার ওপর দুদিনের ধর্মঘট থাকলে বাজারে একেবারেই গ্যাস পাওয়া যাবে না। আর যেসব অসাধু ব্যবসায়ী গোপনে বিক্রি করবে, তারা কয়েক গুণ বেশি দাম হাঁকাবে। একদিন গ্যাস না থাকলে আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের চুলো জ্বলবে না। ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে আমাদের মতো জিম্মি করে বিপদে ফেলছে।”
লাইনের গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারের চড়া দামের কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় গৃহিণী তাহমিনা বেগম বলেন, “ব্যবসায়ীদের কমিশন কম হলে তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু বিক্রি বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা তো দাম নির্ধারণ করি না, তাহলে ভোগান্তি আমাদের কেন হবে? এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের জন্য এখন রান্না করে খাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে।”
সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের হুঁশিয়ারি সম্পর্কে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিইআরসি সব সময় আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করে যৌক্তিকভাবেই এলপিজির দাম পুনঃনির্ধারণ করে থাকে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অসাধু মজুতদার ও নির্ধারিত দাম না মানা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সাথেও আলোচনা করে ধর্মঘট প্রত্যাহার ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এলপিজি খাতে অনিয়ম বাড়ছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার ও কমিশনের অজুহাতে সংকটের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছে। নিজেদের দাবি আদায়ে যখন-তখন বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ভোক্তাদের ভোগান্তিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিইআরসি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম বন্ধে নিয়মিত বাজার তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা জরুরি।”
