ভূমধ্যসাগরের তলদেশে সন্ধান মিলেছে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষের। তুরস্কের কেকোভা দ্বীপের কাছে পাওয়া এই নিদর্শনকে প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে দেখছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। গবেষকদের ধারণা, জাহাজটি এমন এক সময়ে সাগরে চলাচল করত, যখন প্রাচীন মিশরে বিশাল পিরামিড নির্মাণের যুগ চলছিল।
সাগরের প্রায় ৩০ মিটার গভীরে ছড়িয়ে ছিল জাহাজটির বিভিন্ন নিদর্শন। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকায় কাঠের কাঠামো নষ্ট হয়ে গেলেও টিকে রয়েছে মাটির তৈরি অসংখ্য পাত্র, যেগুলো অ্যামফোরা নামে পরিচিত।
তুরস্কের আকদেনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাকান ওনিজের নেতৃত্বে পরিচালিত অনুসন্ধানে তিনটি বড় পাথরের নোঙর এবং ৩০টির বেশি মাটির পাত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অতিরিক্ত নোঙর বহনের বিষয়টি প্রাচীন নৌচলাচল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
জাহাজের কাঠের অংশ অবশিষ্ট না থাকায় সরাসরি কাঠের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তাই গবেষকেরা মাটির পাত্রগুলোর গঠন ও নকশা পরীক্ষা করেন। পাত্রগুলোর দুই পাশে হাতল, মাঝখানে উঁচু খাঁজ এবং নিচের অংশ চ্যাপ্টা। মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বছর আগের পাত্রের সঙ্গে এগুলোর মিল রয়েছে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
উদ্ধার করা পাত্রগুলোর ভেতরে আঠালো ও চকচকে পদার্থের অবশিষ্টাংশও পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার গবেষক ড. কারিন সোওয়াদা এসব নমুনা পরীক্ষা করে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গবেষকদের ধারণা, পাত্রগুলোতে জলপাইয়ের তেল, আঙুর থেকে তৈরি মদ কিংবা উদ্ভিজ্জ সুগন্ধি আঠাজাতীয় দ্রব্য পরিবহন করা হয়ে থাকতে পারে।
প্রাচীনকালে এ ধরনের পাত্র একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া হতো না; বরং বারবার কাজে লাগানো হতো বলে ধারণা করা হয়। ফলে পাত্রগুলোর অবশিষ্টাংশ থেকে সে সময়ের পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১০ মিটার দীর্ঘ জাহাজটি ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এর গন্তব্য প্রাচীন ট্রয় নগরী কিংবা ক্রিট দ্বীপের কোনো বাণিজ্যকেন্দ্র হতে পারে। তবে কেকোভা দ্বীপের আশপাশের প্রবল বাতাস ও তীব্র স্রোতে পড়ে জাহাজটি ডুবে গিয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
গবেষণা দলের সদস্যদের জন্য অনুসন্ধানকাজ ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। পানির নিচে সীমিত সময় অবস্থান করে প্রতিটি নিদর্শন সাবধানে পরীক্ষা ও উদ্ধার করতে হয়েছে। প্রধান গবেষক অধ্যাপক ওনিজের কাছে এই আবিষ্কার বিশেষ আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, হাজার হাজার বছর আগে এসব পাত্র তৈরি ও জাহাজে তোলার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবন সম্পর্কে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে এই অনুসন্ধান।
এর আগে গ্রিসের উপকূলে পাওয়া প্রায় ৪ হাজার ২০০ বছরের পুরোনো একটি জাহাজকে প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কেকোভার আবিষ্কারটি সেই সময়কালকে আরও পেছনে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো বাণিজ্যিক জাহাজ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্কের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এগুলো স্থানীয় জাদুঘরে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিআলো/শিলি