জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে জরুরি মজুদ থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে জি৭ দেশগুলো।
মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন ধাক্কা ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ—তিন সংকট সামনে রেখেই থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আজ শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। একই সঙ্গে এবারের সভায় উচ্চ সুদহার, খাদ্য ও সারের বাড়তি দাম এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবও গুরুত্ব পাবে। এসব চাপ একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে আগে থেকেই মন্থর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আরো চাপে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ এরই মধ্যে অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই ব্যাংককের বৈঠকে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি পার্শ্ববৈঠকগুলোরও বড় অংশজুড়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিন বছরের মধ্যে প্রথমবার ওয়াশিংটনের বাইরে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে এবারের উচ্চ পর্যায়ের এ সম্মেলনে থাকছেন না মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু ‘রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততা’র কারণে তিনি নিজের পরিবর্তে দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ব্যাংককে পাঠিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর জি২০-এর নেতৃত্বে থাকলেও সংস্থাটির বৈঠকে বেসেন্টের অনুপস্থিতি অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, ইউক্রেনে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার পর আশঙ্কার তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থায় টিকে থাকলেও আবার চাপ বাড়তে শুরু করেছে।
ডিজেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম, সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামনে সম্ভাব্য ‘সুপার’ এল নিনোর প্রভাব একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, চরম উষ্ণতার সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য এ আবহাওয়াগত পরিস্থিতিতে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে জরুরি মজুদ থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে জি৭ দেশগুলো। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে পেট্রলের দাম কমিয়ে আনতে আগ্রহী ট্রাম্প। শুক্রবার রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তির কথাও ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। চুক্তির আওতায় বিশ্ববাজারে আরো ডিজেল সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়নের উৎস সংকুচিত করতে মস্কোর ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে। এ সিদ্ধান্তের দ্রুত সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মূলত স্থলভাগে থাকা বাণিজ্যিক মজুদ থেকে ১০০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট নির্বাহীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দ্রুত সরবরাহযোগ্য মজুদের পরিমাণ এখন কমে আসছে। এতে জ্বালানি বাজার আরো ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে এবং তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। অজয় বাঙ্গা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক এখনই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাচ্ছে না। তবে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।
তার ভাষায়, সমস্যা শুধু এল নিনো নয়। একই সঙ্গে দেখতে হচ্ছে সারের দাম কোথায় যাচ্ছে, জ্বালানি ব্যয় কীভাবে বাড়ছে এবং ঋণের পরিস্থিতি কী দাঁড়াচ্ছে। এসব সংকট একসঙ্গে মিলে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে সামনের কয়েক মাসের জন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও প্রায় একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন।
আইএমএফ ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ থাকার পূর্বাভাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি। আগামী বছরের পূর্বাভাস সামান্য বাড়ানোও হতে পারে। তবে কয়েকটি দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হবে।
বর্তমানে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা। আইএমএফের হিসাবে, বর্তমানে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং ২০৩০ সালের আগেই তা বৈশ্বিক জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উন্নত অর্থনীতিগুলোর ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি। তবে উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদহারের কারণে এসব দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে এল নিনোর ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে না পারায় ধনী দেশগুলোর তুলনায় সরবরাহজনিত ধাক্কা সামাল দেয়ার সক্ষমতাও তাদের কম। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক ঋণ আগামী দিনে আরো বেশি সুদহারে পুনরায় আলোচনা করতে হবে। এসব দেশের সরকারি আয়ের গড়ে ১০ শতাংশের বেশি এরই মধ্যে সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে।
কভিড মহামারী শুরুর দিকে দরিদ্রতম দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িক স্থগিতের উদ্যোগ নিয়েছিল জি২০। তবে এবার একই ধরনের উদ্যোগের প্রতি আগ্রহ খুবই কম বলে জানিয়েছেন জি২০ভুক্ত কয়েকটি দেশের কূটনীতিক। তাদের মতে, উচ্চ ঋণের মাত্রা ও রাজনৈতিক চাপ নতুন ঋণ স্থগিত উদ্যোগের পথে বড় বাধা। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়েও উদ্বিগ্ন অনেক নিম্ন আয়ের দেশ। ঋণ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে কমসংখ্যক কিন্তু আরো গভীর সংস্কারের সুপারিশ করছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে কঠোর ব্যয় সংকোচন বা কৃচ্ছ্রসাধনের চাপ আরো বাড়তে পারে।
ঋণ ন্যায্যতা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ইউরোডাডের পলিসি ও অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার ইওলান্ডা ফ্রেসনিলো রয়টার্সকে জানান, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি আইএমএফের শর্তের কারণে দেশগুলো এরই মধ্যে সরকারি ব্যয় কমাচ্ছে। শর্তসংক্রান্ত নতুন নীতি পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। কেনিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঋণ পুনর্গঠন এড়াতে দেশটি সরকারি ব্যয় কমিয়েছে এবং কর বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।’
ফ্রেসনিলোর মতে, অনেক উন্নয়নশীল দেশ যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার গভীরতা আইএমএফ স্বীকার না করলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমান শাসন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে আইএমএফ ক্রমেই কম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এবারের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে ১০ হাজারের বেশি কর্মকর্তা, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যাংককে যাচ্ছেন। প্রায় ৯০ লাখ মানুষের এ শহরে পৌঁছার অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ ব্যবহার করে। সম্প্রতি সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় হামলার পর এ যাত্রাপথের নিরাপত্তাও উদ্বেগের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
