জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুনেরাহ বিনতে কামাল অভিনয়, নাচ ও উপস্থাপনা—সবক্ষেত্রেই নিজের দক্ষতার ছাপ রাখছেন। সম্প্রতি ‘ব্লেন্ডার্স চয়েস–দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ডস’-এর পঞ্চম আসরে তার অভিনীত ‘দাগি’ সিনেমাটি দর্শকপ্রিয়তার পুরস্কার জিতেছে। ২০২২ সালে এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের প্রথম আসরেও উপস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সুনেরাহ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনয়, শাস্ত্রীয় নৃত্যের অভিজ্ঞতা এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনের নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
সুনেরাহ জানান, উপস্থাপনার কাজটি তার জন্য কখনোই খুব সহজ ছিল না। স্বভাবতই কিছুটা লাজুক হওয়ায় মানুষের সামনে কথা বলতে তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই জড়তা কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। সুনেরাহ বলেন, দ্য ডেইলি স্টারের ওটিটি পুরস্কারের প্রথম আসরে আমি উপস্থাপনা করেছিলাম। অথচ উপস্থাপনা এমন কোনো কাজ নয়, যেটিতে আমি খুব স্বচ্ছন্দ। আমি ভীষণ লাজুক। সাক্ষাৎকারে কথা বলার ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে শিখেছি। আগে এখনকার মতো এতটা কথাই বলতে পারতাম না।
মঞ্চে শাস্ত্রীয় নৃত্যের ঝলক
সুনেরাহর যে শাস্ত্রীয় নৃত্যের ওপর প্রশিক্ষণ রয়েছে, সে তথ্য অনেকেরই অজানা ছিল। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ‘পাতার বাঁশরি’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে সেই দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। সুনেরাহ বলেন, অনেকেই জানতেন না, আমার শাস্ত্রীয় নৃত্যের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই মনে হয়, পাতার বাঁশরি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আমার এই দিকটি দেখতে পেরে সবাই উপভোগ করেছেন।
অনুষ্ঠানে অভিনেতা ইরফান সাজ্জাদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি করাও ছিল তার জন্য আনন্দের এক অভিজ্ঞতা। দুজনের ব্যক্তিত্ব আলাদা হলেও তাদের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া রয়েছে বলে জানান এই অভিনেত্রী। তবে মহড়ার সময় প্রস্তুতির ধরন ভিন্ন থাকায় বেশ মজার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সুনেরাহ বলেন, আমি নিজেই দাঁড়িয়ে ওকে নাচের ধাপগুলো শিখিয়েছি। বারবার মহড়া দিতে হয়েছে। আমার মনে হয়, এতে আমার নিজের পরিবেশনাও আরও ভালো হয়েছে, কারণ আমাকেও বেশি অনুশীলন করতে হয়েছে।
‘দাগি’ নিয়ে দর্শকের ভালোবাসা
সুনেরাহর অভিনীত ‘দাগি’ সিনেমাটি দর্শকদের কাছ থেকে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং পুরস্কারও জিতেছে। তবে সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই তাকে একটি প্রশ্ন বারবার শুনতে হচ্ছে, তা হলো এত প্রশংসা পাওয়ার পরও তিনি কেন কোনো পুরস্কারের মনোনয়ন পাননি। সুনেরাহ বলেন, মানুষ দাগি খুব পছন্দ করেছে। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে এবং পুরস্কার জেতা শুরু করার পর থেকেই অনেকে আমাকে একই প্রশ্ন করছেন, আপনি মনোনয়ন পেলেন না কেন? কোনো পুরস্কার পাচ্ছেন না কেন?
তবে পুরস্কারকেই স্বীকৃতির একমাত্র মাপকাঠি মনে করেন না এই অভিনেত্রী। তার কাছে ছবির সামগ্রিক সাফল্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমি মনে করি না, শুধু পুরস্কারের মাধ্যমেই স্বীকৃতি আসে। অবশ্যই চাই ছবিটি ভালো করুক। কারণ, এতে আমি একটি চরিত্রে অভিনয় করেছি এবং ছবিটির সাফল্য আমার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’
সম্প্রতি নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলেন সুনেরাহ। প্রদর্শনীর সময় দর্শকদের প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তিনি। দর্শকেরা ছবিটি কীভাবে গ্রহণ করছেন, তা জানার প্রবল আগ্রহ ছিল তার মধ্যে। সুনেরাহর ভাষায়, দর্শকেরা সত্যিই ছবিটি উপভোগ করেছেন। গল্প, নির্মাণ এবং আমাদের অভিনয়, সবকিছুরই প্রশংসা করেছেন।
ছবিটিতে তার বিয়ের সাজও দর্শকদের বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। একজন দর্শক জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে পুরো সিনেমায় একই ধরনের বিয়ের সাজ বজায় রেখেছিলেন তিনি। সুনেরাহ জানান, ভারী লেহেঙ্গা, পূর্ণাঙ্গ বিয়ের সাজ এবং হাতে-পায়ে আলতার মতো রং ব্যবহার করে তাকে ঐতিহ্যবাহী কনের সাজে থাকতে হয়েছিল। প্রতিদিন শুটিংয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতেই কয়েক ঘণ্টা লেগে যেত। তিনি বলেন, মাথায় ঘোমটা ঠিকভাবে আটকে দেওয়ার পর শুটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশরুমেও যেতে পারতাম না! বিষয়টি সত্যিই কঠিন ছিল। তবে পর্দায় সাজটি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
ইউটিউব নাটক ও বদলে যাওয়া দর্শক
বর্তমানে ইউটিউব নাটকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। দর্শকদের দেখার অভ্যাসে পরিবর্তন আসায় বিনোদনশিল্পকেও নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে বলে মনে করেন সুনেরাহ। তার মতে, এখনকার দর্শকেরা দ্রুত কনটেন্ট দেখতে অভ্যস্ত। রিলস দেখা এবং একের পর এক ভিডিও স্ক্রল করার অভ্যাসও তাদের মনোযোগের ধরনে পরিবর্তন এনেছে। বিনা মূল্যে ইউটিউব কনটেন্ট দেখার সুযোগও এর জনপ্রিয়তা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে শুধু ইউটিউব নাটক নয়, সব ধরনের মানসম্মত কনটেন্ট তৈরির ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। সুনেরাহ বলেন, নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে আমরা বসে যে ধরনের কনটেন্ট দেখি, ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও তেমন কাজ দিতে হবে। আমাদেরও সে ধরনের নির্মাণ প্রয়োজন। কখনো সিনেমা দেখি, কখনো সিরিজ, আবার কখনো টেলিভিশন নাটক। সব ধরনের কনটেন্ট থাকা উচিত, কারণ প্রতিটি মাধ্যমের দর্শক আলাদা।
