কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা মরদেহগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষার জন্য নমুনাগুলো ঢাকায় পাঠানো হয়। তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে রিসোর্টের মালিক তানভীরসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মালিকপক্ষের অন্যরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও রিসোর্ট পরিচালনায় অনিয়ম খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির সদস্যরা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহ করেছেন।
পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ নমুনা ঢাকায়
রোববার বিকেল তিনটার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে প্রবেশ করেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ১০টি মরদেহ থেকে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে নমুনাগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ জানান, মরদেহগুলো থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য সেগুলো ঢাকার মালিবাগে পাঠানো হচ্ছে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, পরিচয় শনাক্তের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুনে মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের বিকল্প নেই।
মরদেহের নমুনার পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিদের বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা সন্তানের মতো নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। দুই পক্ষের নমুনা পরীক্ষার ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নিহত ব্যক্তিদের এক স্বজন জানান, রোববার বেলা ১১টার দিকে ঢাকার মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে তাঁদের পরিবারের চার সদস্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। দ্রুত মরদেহের নমুনা পরীক্ষা করে পরিচয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ওই স্বজন বলেন, ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের মরদেহ বা দেহাবশেষের অপেক্ষায় রয়েছেন। দ্রুত পরীক্ষা শেষ করে মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আরএমও সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। এ কাজে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডিএনএ পরীক্ষার নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। হাসপাতালের দায়িত্ব হলো মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। পরবর্তী পরীক্ষা ও পরিচয় শনাক্তের কাজ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ করবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি
রোববার বেলা ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত টুপটুপ রিসোর্ট পরিদর্শন করে। এ সময় কমিটির সদস্যরা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আগুনের সূত্রপাত ও রিসোর্ট পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না।
তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাতের কারণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার বিষয়গুলো তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে এর আগে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি।
তদন্ত শেষে প্রতিষ্ঠানটির কী কী অনিয়ম ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির বিষয়ে তাসনীম জাহান বলেন, নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে তদন্ত কমিটির যোগাযোগ হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মরদেহের সংখ্যার মিল থাকলেও আগুনে মরদেহগুলো অঙ্গার হয়ে বিকৃত হওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
‘আমরা শোক প্রকাশ নয়, জবাবদিহি চাই’
অগ্নিকাণ্ডে নিহত নাসরিন আক্তার মুক্তার মরদেহ বুঝে নেওয়ার অপেক্ষায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে সময় কাটছে তাঁর স্বামী ফয়সাল জাহানের। স্ত্রীর সঙ্গে শেষ ভিডিও কলের স্মৃতি তাঁকে বারবার আবেগাপ্লুত করে তুলছে। শোকের পাশাপাশি প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়া এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ফয়সাল জাহান বলেন, ‘আমি জানি, আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই না, আর কোনো স্বামীকে এভাবে তাঁর স্ত্রী হারাতে হোক, আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে হাসপাতালে ছুটতে হোক।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া কোনো রিসোর্ট পরিচালিত হলে এবং কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে তার দায় কার? যাঁদের দায়িত্ব ছিল তদারকি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইন প্রয়োগ করা, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চেয়ে ফয়সাল জাহান বলেন, ‘আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই, কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে।’
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দেশের সব হোটেল ও রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোরভাবে যাচাই করার দাবি জানান।
ফয়সাল জাহানের ভাষায়, ‘আমার স্ত্রীকে ফিরে পাব না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিবারের মৃত্যুফাঁদ হয়ে না থাকে। আমরা শুধু শোক প্রকাশ নয়, জবাবদিহি চাই, বিচার চাই।’
বড় ভাই, ভাবি ও দুই শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন নঈমুদ্দিন
অগ্নিকাণ্ডে বড় ভাই, ভাবি ও তাঁদের দুই শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন নঈমুদ্দিন। পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ তিনি।
নঈমুদ্দিনের অভিযোগ, রিসোর্টে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ ও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে হয়তো এত মানুষের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবন থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকলে মানুষ নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেত। ভবন নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগুন কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
নঈমুদ্দিন বলেন, সংবাদমাধ্যমে তাঁরা জানতে পেরেছেন, ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অগ্নিকাণ্ডে বন্ধু নাহিদকে হারিয়েছেন জুয়েল রানাও। তিনি বলেন, ‘আমি নাহিদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধু। নাহিদ আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল, আমার কলিজার টুকরা ছিল সে। ওকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
জুয়েল রানা বলেন, এ ঘটনায় কেউ দায়ী থাকলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
আহত তিনজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে
অগ্নিকাণ্ডে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক দম্পতিসহ তিনজনকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আরএমও সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল।
তিনি বলেন, চিকিৎসক দম্পতি তুলনামূলকভাবে কম আহত হলেও নিজেদের ইচ্ছায় ঢাকায় যেতে চেয়েছেন। অন্যদিকে মেহেরুন্নিসা নামের এক নারী গুরুতর আহত হওয়ায় তাঁকে তাঁর স্বামীসহ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আহত আরও দুজন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁদের আঘাত তুলনামূলকভাবে সামান্য হওয়ায় তাঁরা ছাড়পত্র নিয়ে পরিবারের কাছে ঢাকায় চলে গেছেন। বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডে আহত আর কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই বলে জানান তিনি।
অবহেলার অভিযোগে মামলা, গ্রেপ্তার ম্যানেজার
অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। পুলিশের একজন উপপরিদর্শক বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টি সামনে এসেছে। যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
মামলায় মালিক তানভীরসহ মোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মালিকপক্ষের অন্যরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ। অন্যদিকে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রিয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। তাঁরা দ্রুত মরদেহ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
