ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট ও সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য অভিবাসননীতিকে দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। অন্যদিকে, ফ্রান্সের বিক্ষোভ নিয়ে রসিকতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার ফ্রান্সজুড়ে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বেশির ভাগ স্থানে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে রাতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা প্যারিসে দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন। লিওঁ শহরে পর্যটন দপ্তরে আগুন দেয়া হয়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে আগুনে ১৪৩ বছরের পুরোনো সিটি হলের চূড়া ধসে পড়ে।
রোববার বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমলেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা দেখা যায়। প্যারিসের ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। সপ্তাহান্তের শেষে প্যারিসকে ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ মতো দেখাচ্ছিল বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান শহরটিতে আসা এক দর্শনার্থী।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরে প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের দাবিতে শুরু হওয়া ওই ধর্মঘটের দাবি মেনে নেয়া হলেও পরে আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।
শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে ফ্রান্সের একটি বড় ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য ৫৭ বছর বয়সী মারিয়া পালাস সিএনএনকে বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বেকারত্বসহ নানা সমস্যার কারণে মানুষ ক্ষুব্ধ। তরুণদের কাজের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তারা কিছুই পাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্যারিসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা পাওলা ফোরমেন্তি বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে ‘ন্যায্য’ বলে উল্লেখ করেন। তবে তিনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের সহিংসতা এড়াতে মানুষের বিক্ষোভের জবাব দেয়া এবং তাদের কথা শোনা প্রয়োজন।
রোববারের ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কথা স্বীকার করেন। জ্বালানির দাম মোকাবিলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ’ নেয়ার কথা জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেননি।
এদিকে, ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ হয়েছে। বেলজিয়ামে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা নিয়ে প্রতিবাদ করেন। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার কয়েক হাজার মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে মিছিল করেন। ইতালির মিলানে টানা দুই রাত ধরে অস্থিরতা চলে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছোড়েন ও সুপারমার্কেটে লুটপাট চালান। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে কথিত সরকারি দুর্নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছে। এ সপ্তাহান্তে রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। একটি ছবিতে এক ব্যক্তিকে দাঙ্গা পুলিশের দিকে পেট্রলবোমা ছুড়তে দেখা যায়।
বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিমোজ শহরের আগুনে জ্বলতে থাকা সিটি হলের একটি ভিডিও পোস্ট করে এ অস্থিরতার জন্য ব্যর্থ অভিবাসননীতিকে দায়ী করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ সপ্তাহান্তে জর্জিয়ায় এক সমাবেশে ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রসঙ্গ তোলেন। রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ী হলে ৫ হাজার ডলার লভ্যাংশ দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা উল্লেখ করে তিনি রসিকতা করে বলেন, “চলুন ফ্রান্সে যাই, বিপ্লবে যোগ দিই এবং সেখানে আমাদের ৫ হাজার ডলার খরচ করি।”
ফ্রান্সের বিক্ষোভ ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি আগামী বসন্তে দেশটির নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লে পেন দাবি করেছেন, ‘ন্যায্য সামাজিক অসন্তোষকে আবারও কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করেছে।’ অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো বারবার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন।
