লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায় সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। তাঁদের কেউ বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। কারও সঙ্গে স্থানীয় দলীয় নেতাদের রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁদের অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনোনীত কয়েকজন ডিলার ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা।
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেরই আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসা করেও ডিলার হতে পারেননি—এমন আবেদনকারীরাও রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, নীতিমালায় অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়নি।
লক্ষ্মীপুরের ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। ওই সময় পর্যন্ত ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে। পরে ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের সই করা চিঠিতে ৫৭ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কেউ দলের পদধারী, কেউ সক্রিয় কর্মী। কয়েকজনের ক্ষেত্রে স্থানীয় দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কথাও জানা গেছে। তবে বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে যুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন।
নীতিমালায় যেসব শর্ত রয়েছে
সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। সেখানে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। একই গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও রয়েছে।
দলীয় পদে থাকা অনেকেই পেয়েছেন ডিলারশিপ
মেঘনার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন। সয়াবিনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হওয়ায় কৃষিপ্রধান এ ইউনিয়নে সারের চাহিদা রয়েছে। ইউনিয়নটির সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। তাঁর প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটিরও আগে সার ব্যবসা ছিল না বলে জানা গেছে।
রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসান আইনানকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাঁরও আগে সার ব্যবসা ছিল না। একই উপজেলার বামনী ইউনিয়নে মেসার্স আমির হোসেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন ওরফে ছুটু ডিলার হয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনিও এবার নতুন করে সার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।
উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মাসুদ মিয়াকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। চরমোহনা ইউনিয়নে ভূঁইয়া ট্রেডার্সের মালিক ফাহিম ভূঁইয়া ডিলার হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। তাঁরও আগে সার ব্যবসা ছিল না বলে জানা গেছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেন ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তাঁর প্রতিষ্ঠান রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসা করে।
রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স আবদুল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী ডিলার হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। করপাড়া ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ।
কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব গিয়াস উদ্দিন।
চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত মাহবুবুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা গেছে। তাঁর চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারীর প্রতিষ্ঠানও পাটারীরহাট ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে।
হাজিরহাট ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন। চর কাদিরা ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন। তাঁদের কেউ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন ব্যবসা করেও ডিলার হতে পারেননি অনেকে
২০০২ সাল থেকে চন্দ্রগঞ্জ বাজারে সার বিক্রি করছেন মো. শোভন। এবার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।’
রায়পুরের চর কাদিরা ইউনিয়নে ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ইউনিয়ন যুবদলের নেতা শাহেদ হাওলাদার। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই।
শাহেদ হাওলাদার বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসা থাকার বিষয়টি ছিল। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সারের ব্যবসা করছি। কিন্তু আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। এটি দুঃখজনক ও হতাশাজনক।’
কমলনগরের চর মার্টিন ইউনিয়নে ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সদস্য তারেক রহমান ওরফে রকি। তাঁর দাবি, পৈতৃক সূত্রে তাঁদের পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের প্রতিষ্ঠান আগে সার ডিলারও ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। এবার আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি।
তারেক রহমান বলেন, ‘অযোগ্য ব্যক্তিদের সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের মনোনীত করা হয়েছে, তাদের গুদাম নেই। এমনকি অনেকেরই নেই সার বিক্রির অভিজ্ঞতা। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’
তিনি অভিযোগ করেন, কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের বাণিজ্য করেছেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সারের ডিলার নিয়োগে দলীয়ভাবে আমরা কোনও হস্তক্ষেপ করিনি। সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় ডিলার হয়েছেন। পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেন আমার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। আর চর ফলকন ইউনিয়নের মাহবুবুর রহমানকে আমার ভাগনে বলা হলেও বিষয়টি সত্য নয়। তিনি আগে ছাত্রদল করতেন, এখন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে আমাদেরও প্রত্যাশা ছিল, নীতিমালা অনুযায়ী আগে থেকে যারা সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তারাই ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার পাবেন।’
মনোনীত ডিলারদের বক্তব্য
রায়পুরের দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে মনোনীত ডিলার আমিনুল আজিজ বাদশা রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমি যথাযথ কাগজপত্র জমা দিয়ে ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছি।’
রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশ বলেন, ‘এখানে সারের চাহিদা কম। তারপরও ডিলারশিপ নিয়েছি। এতে রাজনৈতিক তদবির ছিল না।’
রায়পুরের বামনী ইউনিয়নের মনোনীত ডিলার আমির হোসেন ওরফে ছুটু বলেন, ‘আগে অনেক ব্যবসা করেছি। সার ব্যবসায় এবার নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছি। নিজের যোগ্যতা বলেই মনোনীত হয়েছি।’
কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাঁকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি।
সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে অন্য কেউ আর আবেদন করেননি। আমি একমাত্র আবেদনকারী ছিলাম। সার্বিক বিচারে আমাকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
প্রশাসনের বক্তব্য
ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানকে ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি, বার্তা পাঠাতে বলেন। পরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংখ্যা বেশি—এমন তথ্য তিনিও জেনেছেন। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত করে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের দলের নেতাকর্মীরা সারের ডিলারসহ বিভিন্ন কিছু থেকে বঞ্চিত ছিলেন। দল ক্ষমতায় আসার পর এখন অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে সারের ডিলারের জন্য তারা আবেদন করেছেন। সবাই নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন। মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের কোনও প্রভাব ছিল না।’
সানা/আপ্র/২৩/১০/২০২৬
