ঢাকা,১৬ অক্টোবর-অসীম মহাবিশ্বের শতকোটি গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে পৃথিবীই একমাত্র প্রাণে ভরা নীলাভ আবাসস্থল। আর পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো জল।
আধুনিক বিজ্ঞান যেমন পৃথিবীতে জীবনের সূচনাকে জলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনি হাজার হাজার বছর আগে বৈদিক ঋষিরাও জলকে সৃষ্টির আদি তত্ত্ব হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন।
ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে সৃষ্টির আগের অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, সৃষ্টির শুরুতে সর্বত্র ছিল অন্ধকারে ঢাকা এক অসীম জলরাশি। সনাতন ভাবনায় পঞ্চমহাভূতের মধ্যে ‘অপ’ বা জলই সেই মূল উপাদান, যা অন্য সব উপাদানের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে। নদী, বৃষ্টি, পুকুর, বিল ও সমুদ্রকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপসী বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি। জলের এই গভীর উপস্থিতিকে এবারের দুর্গাপূজার ভাবনায় ধারণ করে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন বেছে নিয়েছে এক অনন্য থিম—‘জলজ’, অর্থাৎ জল থেকে যার জন্ম।
সনাতন ধর্মে জল শুধু একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়; জল নিজেই পবিত্রতা, পরমেশ্বর ও পরম সংস্কারের প্রতীক। মাতৃগর্ভের তরল থেকে শুরু করে গঙ্গার তীরে জীবনের শেষ অঞ্জলি পর্যন্ত মানুষের পুরো জীবনচক্র জলের প্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মাঙ্গলিক কাজের সূচনা, ঘটস্থাপন, তর্পণ, হোম কিংবা আত্মশুদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই জল প্রধান মাধ্যম। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী মা শুধু শক্তির প্রতীক নন, তিনি জীবের জীবনধারণের মূল আকুতি—‘তৃষ্ণারূপেণ সংস্থিতা!’ জলের বুক চিরে যেমন পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, তেমনি জীবচেতনার তৃষ্ণা থেকেই আবির্ভূত হন মহাশক্তি মা দুর্গা।
এই ভাবনাকে সামনে রেখে এবার গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের মণ্ডপসজ্জায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, কুটিরশিল্প, আলোক-নকশা ও নানা ধরনের অলংকরণের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশাল এক জলজ জৈব-রূপকল্প। বাঁশ, বেত, প্রাকৃতিক তন্তু ও চটের মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হবে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। এটি স্থির বিশাল এক উর্মিমালার মতো দর্শকদের ঘিরে রাখবে। প্রবেশপথ থেকে মণ্ডপের ভেতরের অংশ পর্যন্ত দর্শকদের যাত্রা হবে এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, যেখানে প্রকৃতির উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে মাতৃচরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হবে। জলপ্রপাত, রিফ্লেকশন পুল ও আলোর সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হবে পরিবর্তনশীল এক পরিবেশ। আর প্যান্ডেলের মাঝখানে থাকবে পদ্মের আদলে তৈরি বিশাল একটি স্থাপত্য। সেখান থেকে জলের গভীরতা থেকে প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো শঙ্খ-পটে উদ্ভাসিত হবেন আদ্যাশক্তি মা দুর্গা।
তবে ‘জলজ’ শুধু ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক ও পরিবেশগত সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী দখল ও জলদূষণের কারণে পৃথিবীর জলচক্র মারাত্মক সংকটের মুখে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এই সংকট অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই জলকে সম্মান করা ও রক্ষা করার অর্থ হলো জীবন, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা। ‘জলজ’ তাই মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া, প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং জীবমণ্ডলকে রক্ষা করার এক আনন্দময় আহ্বান।
জল, পদ্ম, তীর্থবারি, তৃষ্ণা ও পরম জীবন—সবকিছুকে একসূত্রে মিলিয়ে দেবী দুর্গার কাছে আমাদের আকুল প্রার্থনা, মা, তুমি বিশ্বসংসারকে তৃষ্ণামুক্ত করো, জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করো এবং মানুষকে সংহারের পরিবর্তে সৃষ্টির শক্তি দাও।
গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং স্থপতি অমিতি কুন্ডু ও শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার পরিকল্পনা, নকশা ও তত্ত্বাবধানে বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে শারদোৎসবের এই অভিনব ও দৃষ্টিনন্দন সার্বজনীন মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য মণ্ডপটি উন্মুক্ত থাকবে।
এস এম/ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
