দক্ষিণাঞ্চলের নদী বেষ্টিত জেলা পিরোজপুর। এখানকার অন্যতম নদীগুলো হলো- কঁচা, বলেশ্বর, সন্ধ্যা, কালীগঙ্গা ও মধুমতি। এসব নদী একদিকে যেমন জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়িয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য হয়ে উঠেছে বড় বাধা। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে নদীতে দুর্ঘটনা ও পানিতে ডুবে নিখোঁজের ঘটনা।
এসব দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য পিরোজপুরে ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে নেই কোনো নিজস্ব ডুবুরি দল বা স্পিডবোট। ফলে নদী কিংবা খালে যে কোনো নৌযান দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আসার দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের।
আরো পড়ুন: পিরোজপুরে ট্রলার ডুবি: মেয়ের মরদেহ উদ্ধার, মা নিখোঁজ
জেলার সাতটি উপজেলার কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশনই ‘ক’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নয়। এই শ্রেণির ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে থাকা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পিরোজপুরবাসী। এছাড়া, জেলায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম না থাকায় প্রায়ই বিলম্বিত হচ্ছে উদ্ধার অভিযান। এতে একদিকে স্বজনদের আহাজারি দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি ও উদ্ধারকর্মীদের ভোগান্তি।
নদীবেষ্টিত এই জেলায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্ধার অভিযান নিশ্চিত করতে পিরোজপুর ফায়ার সার্ভিসকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ, নিজস্ব ডুবুরি দল গঠন ও প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের দাবি স্থানীয়দের।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) পিরোজপুরের নাজিরপুরে শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এসময় ট্রলারে থাকা অন্যরা ফেরির পন্টুনে উঠলেও শংকর বেপারী নামে এক যাত্রীর স্ত্রী ও মেয়ে নিখোঁজ হন। পরে পিরোজপুর ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছালেও ডুবুরি না থাকার কারণে তারা উদ্ধার কাজ শুরু করতে পারেননি। পরে বরিশাল থেকে ডুবুরি এনে নিখোঁজদের উদ্ধার কাজ শুরু করেন।
স্থানীয়রা জানান, পিরোজপুরে প্রচুর নদী ও খাল রয়েছে। এখানকার নদ-নদীতে দুর্ঘটনা ঘটলে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আনতে হয়। ফলে সময়মতো কাজ শুরু করা যায় না। এ ছাড়া জেলায় একটি রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণের কথা থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নৌ দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তাৎক্ষণিক নেভানোর মতো আধুনিক কোনো স্পিডবোটও নেই। নিখোঁজের তালিকা যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি আগুনে ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে।
শ্রীরামকাঠিতে ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ হওয়া রীনা বেপারীর স্বামী শংকর বেপারী বলেন, আমাদের জেলায় ফায়ার সার্ভিস আছে কিন্তু ডুবুরি দল নেই। সোমবার ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে রাত ৮টায় আর বরিশাল থেকে ডুবুরি আসে রাত ১০ টায়। সারারাত খুঁজেও আমার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। তাৎক্ষনিক ডুবুরি দল আসলে হয়তো আমার স্ত্রীকে রাতেই খুঁজে পেতাম। হয়তো আমার স্ত্রী-মেয়েকে এভাবে প্রাণ দিতে হতো না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মাজেদুল কবির রাসেল বলেন, পিরোজপুর জেলায় নদ-নদী, খাল-বিল বেশি। এখানে প্রায়ই নদী ও খালে ডুবে মানুষ নিখোঁজ হয়। বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আসতে আসতে অনেকেই মারা যান। দীর্ঘ ১৭ বছরে এ জেলার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনগুলো আধুনিকায়ন করা হয়নি। এখানে ডুবুরি দল ও স্পিডবোট পদায়ন করা খুবই জরুরি।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক রায়হানুল আশরাফ বলেন, ফায়ার ফাইটারদের সবসময় সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে হয়। তবে, পিরোজপুর জেলার স্টেশনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পিরোজপুর ফায়ার সার্ভিসকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা, একটি রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, নিজস্ব ডুবুরি ইউনিট গঠন এবং জনবল সংকট নিরসনের বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
