স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং সংস্কারকাজ বন্ধ রাখায় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় আট কোটি টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প, অসমাপ্ত সেতু ও সড়কের নির্মাণকাজ এবং মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ায় কুমিল্লায় এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়নকাজে নতুন করে গতি সঞ্চারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এলজিইডি কুমিল্লা সূত্র জানায়, ঠিকাদাররা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না করায় সিআইবিআরআর (CIBRR) প্রকল্পের আওতায় দাউদকান্দি উপজেলায় ৫৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু, ইউএইচবিপি (UHBP) প্রকল্পের আওতায় ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু এবং আরসিআইপি (RCIP) প্রকল্পের আওতায় বরুড়া উপজেলার বাইচাপুকুরিয়া-আড্ডা বাজার-কচুয়া সড়ক, দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাজার এবং ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়া বাজারের কাজের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মোট ৭ কোটি ৫২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৩ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, কুমিল্লায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বেশ কিছু উন্নয়নকাজে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারি বিনিয়োগের সুফল ব্যাহত হচ্ছিল। দুর্ভোগ পোহাচ্ছিলেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দারা। তবে পুরোনো জটিলতা চিহ্নিত করে তা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ায় এসব কাজে নতুন করে গতি সঞ্চারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিজ উদ্দিন (বাবলু) দায়িত্ব নেওয়ার পর অসমাপ্ত প্রকল্প সচল করা, আইনি জটিলতা নিরসন এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের মতো উদ্যোগে অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এলজিইডি কুমিল্লা সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা উন্নয়নকাজগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে একে একে জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্রাহ্মণপাড়া ও দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাজার এলাকার দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
বরুড়া উপজেলায় আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় অসমাপ্ত উন্নয়নকাজগুলো পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কুমিল্লা জেলার সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এসব কাজ শেষ হলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দাউদকান্দি উপজেলায় ৫৭০ মিটার ও ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি অসমাপ্ত সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সেতু দুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় আইআরডিপি-৩ ও আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কাজগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে উন্নয়নকাজ শেষ করাই এখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্যতম লক্ষ্য।
লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা দুটি সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেতু দুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য পরিবহনে সুবিধা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, তিতাস, মেঘনা ও বরুড়া উপজেলায় সিসিবি (CCB) প্রকল্পের আওতায় অসমাপ্ত সেতুগুলোর কাজ শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পগুলোর কাঙ্ক্ষিত সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বুড়িচং উপজেলায় মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সিডিডব্লিউএসপি (CDDWS P) প্রকল্পের একটি সড়কের কাজেও অগ্রগতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জটিলতা নিরসন করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সড়কটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুধু মাঠপর্যায়ের উন্নয়নকাজ নয়, এলজিইডি কুমিল্লা কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার সমাধানেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কার্যালয়ের নিরাপত্তাপ্রহরীদের জন্য গার্ডরুম স্থাপন নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনের পর গার্ডরুম স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে নিরাপত্তাকর্মীদের কাজের পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কার্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কার্যালয় প্রাঙ্গণের সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে আধুনিক মানের মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে কার্যালয়ের পরিবেশ আরও পরিচ্ছন্ন, নান্দনিক ও ব্যবহারবান্ধব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রকল্পগুলোকে শুধু নথিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে আসাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রশাসনিক ও কারিগরি সমন্বয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এলজিইডি কুমিল্লা এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পুরোনো জটিলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে অসমাপ্ত কাজগুলোর বাস্তব অগ্রগতি, নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এবং কাজের মান বজায় রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো শেষ হলে জেলার বিভিন্ন এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ কমাতে তা ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিজ উদ্দিন (বাবলু) জানান, কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে উন্নয়নকাজে অগ্রগতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন হলে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলার সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা বাড়বে।
