মলকূপ পরিষ্কারের কাজ সাধারণত তিন-চারজন শ্রমিক মিলে করতেন। তাদের একজন গর্তে নেমে বেলচা দিয়ে বর্জ্য তুলে বালতিতে ভরতেন। আরেকজন দড়ি দিয়ে বালতি ওপরে টেনে তুলতেন।
১৬৬০ সালের এক সকালে নিজের বাড়ির ভূগর্ভস্থ কক্ষের দরজা খুলেছিলেন ইংরেজ দিনলিপিকার স্যামুয়েল পেপিস। কিন্তু ঘরে ঢুকেই পা পড়ল মলমূত্রের বিশাল স্তূপে। প্রতিবেশীর শৌচাগার উপচে সে বর্জ্য ছড়িয়ে পড়েছিল তার বাড়িতে। ঘটনাটি পেপিসের দিনলিপিতে জায়গা করে নিয়েছিল। তবে সে সময়ের লন্ডনে এমন অভিজ্ঞতা মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। বাড়ির শৌচাগার উপচে পড়া, রাস্তায় মলমূত্র ছড়িয়ে থাকা কিংবা কূপের পানিতে বর্জ্য মিশে যাওয়া ছিল নগরজীবনের পরিচিত সমস্যা।
বর্তমানে শৌচাগার ব্যবহার করে ফ্লাশ টানলেই বর্জ্য চলে যায় চোখের আড়ালে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগেও ইউরোপের উন্নত শহরগুলোয়ও এমন সুবিধা ছিল না। মানুষের মলমূত্র জমত বাড়ির নিচের গর্তে, দুর্গের দেয়ালঘেঁষা নালায় কিংবা যৌথ শৌচাগারের পাশে। গর্ত ভরে গেলে সেগুলো পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিতে হতো একদল শ্রমিককে। রাতের অন্ধকারে তারা নামতেন মলকূপে, বেলচা দিয়ে বর্জ্য তুলতেন, বালতি ভরে ওপরে পাঠাতেন। তাদের কাজের বিনিময়ে মিলত পারিশ্রমিক; বিনিময়ে সহ্য করতে হতো অসহনীয় দুর্গন্ধ, সামাজিক অবজ্ঞা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তো ছিলই।
উনিশ শতকে শারীরিক শ্রমের প্রায় সব পেশার মতো এটিও ছিল পুরুষদের কাজ। এমন পুরুষ, যাদের নাক দিয়ে গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা না থাকলেই যেন ভালো হতো! ইংল্যান্ডে এ শ্রমিকেরা পরিচিত ছিলেন ‘গং ফার্মার’ বা ‘নাইটম্যান’ নামে। নাইটম্যান পেশার মানুষকে নাইট সয়েল রিমুভার বা রাতের বর্জ্য সংগ্রাহকও বলা হতো। উনিশ শতকের সবচেয়ে ঘৃণ্য ও দুরূহ পেশাগুলোর একটি ছিল এটি।
মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে শৌচাগারের ধরন নির্ভর করত মানুষের সামাজিক অবস্থানের ওপর। দুর্গের অভিজাত বাসিন্দারা ব্যবহার করতেন গার্ডেরোব—দুর্গের দেয়ালে নির্মিত ছোট শৌচাগার, যার নিচ দিয়ে বর্জ্য নামার নালা থাকত। নিউক্যাসল দুর্গের কিপ অংশে গার্ডেরোবের নালাগুলো একটি কক্ষে গিয়ে মিলেছিল। ধারণা করা হয়, সেটি ছিল মলমূত্র জমা রাখার গর্ত বা সেসপিট।
‘চরিত্রটি ওল্ড ফাদার টেমস’ নামে পরিচিত ছবি: লন্ডন মিউজিয়াম
সাধারণ মানুষের ব্যবস্থা ছিল আরো সীমিত। অনেককে যৌথ শৌচাগার ব্যবহার করতে হতো। অন্যরা বাড়ির বাইরে কাঠের ছোট ঘর বানিয়ে তার নিচে খুঁড়তেন মলকূপ। গর্তের দেয়াল এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে তরল বর্জ্য চুইয়ে মাটিতে চলে যেতে পারে এবং কঠিন বর্জ্য জমে থাকে ভেতরে। কিন্তু এ ব্যবস্থায় গর্ত একসময় ভরে উঠত, ছড়িয়ে পড়ত দুর্গন্ধ, দেখা দিত দূষণের ঝুঁকি। তখন প্রয়োজন হতো গর্ত খালি করার। এ কাজ করতেন ‘গং ফার্মাররা’। ‘গং’ শব্দটির উৎস পুরনো ইংরেজি গান, যার অর্থ ‘যাওয়া’। পরবর্তী সময়ে শব্দটি শৌচাগার ও তার বর্জ্য বোঝাতেও ব্যবহার হয়। রাতের বেলায় কাজ করায় তাদের বলা হতো ‘নাইটম্যান’—রাতের শ্রমিক।
দিনের আলোয় মলমূত্রভর্তি গাড়ি রাস্তায় চলুক, তা নগরবাসী চাইত না। তাই শহর যখন দিনের কোলাহল পেরিয়ে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ত, তখনই কাজে নামতেন নাইটম্যানরা। রাত ৯টার দিকে শুরু হতো তাদের কর্মযজ্ঞ, চলত ভোর ৫টা পর্যন্ত। অন্যদের কাছে রাত ছিল বিশ্রামের সময়, তাদের কাছে সেটিই ছিল শহরের নোংরা বোঝা সরিয়ে নেয়ার ব্যস্ততম প্রহর।
মলকূপ পরিষ্কারের কাজ সাধারণত তিন-চারজন শ্রমিক মিলে করতেন। তাদের একজন গর্তে নেমে বেলচা দিয়ে বর্জ্য তুলে বালতিতে ভরতেন। আরেকজন দড়ি দিয়ে বালতি ওপরে টেনে তুলতেন। বাকি শ্রমিকেরা সেগুলো বয়ে নিয়ে বর্জ্যবাহী গাড়িতে রাখতেন। এরপর বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হতো শহরের বাইরের নির্দিষ্ট স্থানে। কখনো তা কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হতো, কারণ মানববর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জমিতে সার হিসেবে ব্যবহারের চল ছিল।
কতদিন পর পর মলকূপ পরিষ্কার করতে হতো, তা নির্ভর করত গর্তের আকার ও ব্যবহারকারীর সংখ্যার ওপর। তবে পরিষ্কারের কাজ পিছিয়ে গেলে পরিণতি হতো ভয়াবহ। বর্জ্য উপচে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়তে পারত, আবার চুইয়ে মিশে যেতে পারত আশপাশের কূপের পানিতে। তাই গং ফার্মারদের কাজ কেবল গর্ত খালি করায় সীমাবদ্ধ ছিল না। মলমূত্র বহনকারী নালায় বর্জ্য জমে গেলে তা পরিষ্কার করতে হতো।
সামাজিক মর্যাদা কম হলেও নাইটম্যানদের পারিশ্রমিক একেবারে নগণ্য ছিল না। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকের কিছু হিসাবপত্রে প্রতি টন বর্জ্য অপসারণের জন্য দুই শিলিং দেয়ার উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিবরণে এ অর্থের বর্তমান মূল্য আনুমানিক ৬৬ পাউন্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে; যদিও ঐতিহাসিক অর্থমূল্যের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা নির্ভর করে হিসাবের পদ্ধতির ওপর।
পারিশ্রমিকের বাইরে বিশেষ উপহার পাওয়ার নজিরও ছিল। ১৫৭৭ সালে সেন্ট মেরি উলনথ গির্জার হিসাবপত্রে একজন ‘গং ফার্মার’-কে চার পাউন্ড মোমবাতি দেয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলো সম্ভবত মৌমাছির মোম দিয়ে তৈরি ছিল, যা সাধারণ মোমবাতির তুলনায় বেশি সময় ধরে জ্বলত এবং দামও ছিল বেশি। গির্জার প্রার্থনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ ধরনের মোমবাতি ব্যবহার হতো। এমনকি রানী প্রথম এলিজাবেথের অধীনে কর্মরত একজন ‘গং ফার্মার’ পারিশ্রমিকের অংশ হিসেবে ব্র্যান্ডি পেতেন বলেও প্রচলিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু অর্থ বা উপহার দিয়ে এ পেশার দুর্ভোগের ক্ষতিপূরণ হতো না। টিউডর যুগে ইংল্যান্ডে তামাকের প্রচলন শুরু হলে কিছু ‘গং ফার্মার’ দুর্গন্ধ মোকাবেলার আশায় ধূমপান শুরু করেন। গর্তের ভেতরে বায়ু চলাচলের সুযোগ ছিল সীমিত। পচনশীল বর্জ্য থেকে তৈরি গ্যাস জমে থাকত সেখানে। অক্সিজেনের অভাব কিংবা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। দীর্ঘ সময় মলমূত্রের সংস্পর্শে থাকায় সংক্রমণসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যাও জড়িত ছিল।
এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সামাজিক অবজ্ঞা। দুর্গন্ধ ও কাজের ধরন নিয়ে মানুষের বিরূপ মনোভাবের কারণে অনেকেই তাদের এড়িয়ে চলতেন। এমনকি তাদের বাড়িঘরও নির্দিষ্ট এলাকায় রাখতে হতো, যাতে সাধারণ মানুষের বসতি থেকে তারা দূরে থাকেন। অর্থাৎ শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য যাদের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি, তাদেরই শহরের সামাজিক পরিসরে জায়গা ছিল সবচেয়ে কম।
লন্ডনের মতো প্যারিসেও বাড়িঘরের বর্জ্য জমা হতো সেসপিটে। গর্ত পূর্ণ হয়ে গেলে তা খালি করার প্রয়োজন হতো। তবে প্যারিসে এ কাজের একটি সংগঠিত ঠিকাদারি কাঠামো গড়ে উঠেছিল। মলকূপ পরিষ্কারের ঠিকাদারি পেতে পুলিশ প্রিফেক্টের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হতো। আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হতো যে তার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি এবং কাজ শেষে সরঞ্জাম রাখার উপযুক্ত গুদাম রয়েছে। ঠিকাদারদের সরঞ্জাম বছরে অন্তত দুবার পরীক্ষা করার বিধান ছিল। যন্ত্রপাতি অপ্রতুল বা অচল পাওয়া গেলে লাইসেন্স বাতিল হতে পারত।
তবে ঠিকাদারি ব্যবস্থার শৃঙ্খলা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করতে পারেনি। মলকূপের ভেতরে পচনশীল বর্জ্য থেকে হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো গ্যাস তৈরি হতো। আবার প্রস্রাবের পরিমাণ বেশি হলে অ্যামোনিয়াযুক্ত বাষ্প তৈরি হতো, যা শ্রমিকদের চোখে জ্বালা ও প্রদাহ সৃষ্টি করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা এতটাই তীব্র হতো যে সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং কয়েক দিন কাজ বন্ধ রাখতে হতো।
মলকূপ থেকে সংগৃহীত বর্জ্য শুধু ফেলে দেয়ার উপাদান ছিল না। কৃষিকাজে এর ব্যবহারযোগ্যতা থাকায় প্যারিসে মানববর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ‘পুদ্রেত’ নামে এক ধরনের গুঁড়া সার তৈরি করা হতো। ১৭৮৭ সালে জাক ব্রিদে বর্জ্য শুকানোর একটি পদ্ধতি চালু করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। এর মাধ্যমে মানববর্জ্যের পুষ্টি উপাদান কৃষিকাজে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
উনিশ শতকে ইউরোপের বড় শহরগুলোয় আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে শুরু করলে ‘গং ফার্মার’ ও ‘নাইটম্যান’দের ঐতিহ্যবাহী পেশার প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসে। মলকূপ পরিষ্কারের দায়িত্ব ক্রমে ব্যক্তিগত শ্রমিক ও ঠিকাদারনির্ভর ব্যবস্থা থেকে নগর অবকাঠামোর হাতে চলে যায়। এ পরিবর্তনের ফলে একসময় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় তাদের পেশা। তাদের বিদায়ে কেউ বিশেষভাবে শোকাহত হয়েছিলেন—এমনটা কল্পনা করা কঠিন; তবে শহরের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় তাদের দীর্ঘদিনের শ্রম যে একসময় অপরিহার্য ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
শুচিস্মিতা সিদরা: প্রাবন্ধিক
