দোহায় চুক্তির সই শুকানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তকমা লেগে গেল: আরও একটি ‘মুসলিম ন্যাটো’। এটি একটি ভুল চুক্তির জন্য সম্পূর্ণ ভুল একটি তকমা।
গত বুধবার তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান এবং ইন্দোনেশিয়া যৌথ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সামরিক প্রশিক্ষণের ওপর ‘বদর’ নামে একটি প্রতিরক্ষাশিল্প–বিষয়ক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে। কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইন্দোনেশিয়ার উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী এতে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন। এতে কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা বা একে অপরকে সামরিক সুরক্ষার ধারা নেই। আর সেটিই আসল বিষয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান যে ‘মক্কা’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সেটি হলো একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি—যেখানে কোনো একটি দেশের ওপর হামলা বাকিদের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হয়। হুতিদের সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার পর চলতি মাসেই চুক্তিটি সক্রিয় করা হয়েছে।
বদর চুক্তি পুরোপুরি ভিন্ন একটি কাজ করে। মক্কা চুক্তি ঠিক করে—কে কার পাশে দাঁড়াবে, আর বদর চুক্তি উত্তর খোঁজে—কে কী নির্মাণ করবে।
‘বদর’ নামটি হয়তো ঐতিহাসিক ও বিস্তৃত কোনো ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। তুর্কি কর্মকর্তারা জানান, আরবি ‘বদর’ (যার অর্থ পূর্ণচন্দ্র) শব্দটি এই চার দেশের পরিপূরক প্রচেষ্টাকে তুলে ধরে। এর ঐতিহাসিক নামটির সুর কিছুটা সামরিক হলেও চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ শিল্পকেন্দ্রিক। তাই রূপক বা কবিতা দিয়ে নয়, চুক্তিটিকে তার অনুচ্ছেদ দিয়ে বিচার করা উচিত।
এই অনুচ্ছেদগুলো মূলত বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পকে একটি একক কাঠামোর অধীন আনার বিষয়ে কথা বলে, এবং এই প্রকল্পগুলো অত্যন্ত বাস্তব। তুরস্ক ইস্তাম্বুলে দুটি বাবর-ক্লাস কর্ভেট তৈরি করে সরবরাহ করেছে এবং বাকি দুটি সম্পন্ন করতে করাচি শিপইয়ার্ডকে আধুনিকায়ন করেছে। ইন্দোনেশিয়ার পিনদাদ-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাপলান এমটি ট্যাংক তৈরি করছে তুরস্ক।
বদর চুক্তিকে সরাসরি কোনো উন্মুক্ত ক্লাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি, এবং আমি যোগদানের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ঘোষণা দেখতে পাইনি। তবে সামরিক চুক্তির চেয়ে শিল্প–সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ বেশ সহজ। তাই নজর রাখুন—যে দেশগুলো ইতিমধ্যেই তুর্কি সরঞ্জাম কিনছে এবং মক্কা চুক্তির যে সদস্যরা নিজেদের শিল্পকে বদরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়, তাদের ওপর।
কাতারে আসেলসান এবং বারজান হোল্ডিংস মিলে ‘বারক’ পরিচালনা করছে, যা স্থানীয়ভাবে অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করে। কাতারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত সপ্তাহে জানান যে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা উৎপাদন হাব তৈরি হতে যাচ্ছে। সমঝোতা স্মারকটি সহযোগী ও অংশীদার দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতেও কাজ করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা রপ্তানিসহ চার দেশের বাইরের বড় কোনো লক্ষ্যের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এর গঠন কাঠামোর দিকে লক্ষ করা যেতে পারে। এই প্রকল্পগুলো হলো চাকার স্পোকের মতো, আর তুরস্ক হলো এর কেন্দ্র (হাব)। বদর চুক্তির আসল উদ্ভাবন হলো সেই স্পোকগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করা।
যদি পাকিস্তানি প্রকৌশল, কাতারি মূলধন এবং ইন্দোনেশিয়ান উৎপাদন খাত আঙ্কারাকে মধ্যস্থতাকারী না বানিয়ে সরাসরি একই প্রকল্পে কাজ শুরু করতে পারে, তবে বদর এমন কিছু অর্জন করবে যা কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দিয়ে সম্ভব ছিল না।

সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। কাতারে ২০১৭ সালের অর্থনৈতিক অবরোধ, ২০২৫ সালে দোহায় ইসরায়েলি হামলা এবং চলতি বছরে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজধানীগুলোকে শিখিয়েছে যে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল হওয়া কেবল অস্ত্র কেনার বিষয় নয়, এটি একটি বড় নিরাপত্তাহীনতা। মূল সামরিক সরঞ্জামের মতোই এর খুচরা যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার এবং রক্ষণাবেক্ষণ সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের অনুপস্থিতি কোনো অবহেলা বা দূরত্ব নয়; কারণ আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে রিয়াদের প্রতিরক্ষাশিল্প সহযোগিতা ইতিমধ্যেই মক্কা চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। পাকিস্তান দুটি কাঠামোতেই রয়েছে—একটিতে নিরাপত্তা প্রদানকারী এবং অন্যটিতে শিল্প অংশীদার হিসেবে। এই দ্বৈত ভূমিকাটিই বদর চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সত্য।
পরবর্তী সময়ে কে আসছে? সম্প্রসারণের বিষয়টি প্রথমত মক্কা চুক্তির প্রশ্ন। মিসর সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী; বাংলাদেশ ও সিরিয়া সদস্যপদ বিবেচনায় থাকার কথা স্বীকার করেছে; আর বিশ্লেষকেরা কাতারকে এতে যুক্ত হওয়ার স্বাভাবিক দাবিদার হিসেবে দেখছেন।
বদর চুক্তিকে সরাসরি কোনো উন্মুক্ত ক্লাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি, এবং আমি যোগদানের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ঘোষণা দেখতে পাইনি। তবে সামরিক চুক্তির চেয়ে শিল্প–সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর সম্প্রসারণ বেশ সহজ। তাই নজর রাখুন—যে দেশগুলো ইতিমধ্যেই তুর্কি সরঞ্জাম কিনছে এবং মক্কা চুক্তির যে সদস্যরা নিজেদের শিল্পকে বদরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়, তাদের ওপর।
প্রতিবেশীরা এটিকে কীভাবে দেখছে? এই লেখার সময়ে আমি বদর চুক্তি নিয়ে ভারত বা ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য খুঁজে পাইনি। তবে মক্কা চুক্তিতে তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়।
নয়াদিল্লি জানিয়েছিল তারা চুক্তিটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তায় এর প্রভাব পরীক্ষা করছে। একই সঙ্গে ভারতীয় বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন যে ভারত ভারতের জায়গায় থেকেও সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তা মক্কা চুক্তিকে ইসরায়েলবিরোধী জোট আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, মিসর এতে যোগ দিলে তা অবাক করার মতো কিছু হবে না।

আশা করা যায় বদর চুক্তিকেও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হবে এবং সেই মূল্যায়নে বিষয়ের চেয়ে বাড়িয়ে দেখার প্রবণতাই বেশি থাকবে। প্রতিরক্ষা ধারা ছাড়া একটি সমঝোতা স্মারক কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির কাজ করতে পারে না।
আসল পরীক্ষাগুলো অনেক শান্ত ও কঠিন। প্রথমত, বদর কি এমন কোনো প্রকল্প তৈরি করতে পারবে, যেখানে অন্তত তিনটি সদস্যদেশ যুক্ত থাকবে? দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান, মেধাস্বত্ব এবং উৎপাদনের দায়িত্ব কি সমানভাবে ভাগ করা হবে, নাকি মূল চাবিকাঠি কেন্দ্রবিন্দুতেই থেকে যাবে? তৃতীয়ত, মূল উপব্যবস্থাগুলোতে পশ্চিমাদের লাইসেন্সিং সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চুক্তিটি টিকে থাকতে পারবে কি না? প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির চেয়ে অনেক ধীরগতিতে এগোয়।
পূর্ণ চাঁদ রাতের আকাশে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্যই আলো ছড়ায়। বদর একটি দীর্ঘস্থায়ী শিল্প ভিত্তি হয়ে উঠবে নাকি ক্ষণস্থায়ী আলো হয়ে থাকবে, তা দোহার আনুষ্ঠানিক সভাঘরে নয়, বরং কারখানার মেঝেতে নির্ধারিত হবে।
মনসুর কায়সার ইসলামাবাদভিত্তিক লেখক ও পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
