অনেকেরই ভুতের মুভি কিংবা সিরিজ বেশ পছন্দ। কিন্তু মেক্সিকো সিটিতে এমন একটি দ্বীপ আছে, যা যেকোনো হরর মুভির চেয়েও বেশি ভয়ংকর। মেক্সিকো সিটির সোচিমিলকো খালের ভেতরে অবস্থিত এ জায়গাটির নাম ‘লা ইসলা দে লাস মুনেকাস’ বা পুতুলের দ্বীপ।
মাত্র এক একরের এই ছোট্ট দ্বীপে গেলে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের ডালে শত শত পুরোনো ও ভাঙা পুতুল ঝুলে আছে। কোনো পুতুলের হাত নেই, কোনোটার পা নেই, আবার কোনোটার চোখ উপড়ানো। স্থানীয় বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, দ্বীপটি অভিশপ্ত। তাঁদের বিশ্বাস, রাতে এই পুতুলগুলো নড়াচড়া করে এবং নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে।
অদ্ভুত এ রহস্যের কারণেই রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের কাছে দ্বীপটি ঘুরে দেখার একটি জনপ্রিয় জায়গা হয়ে উঠেছে। এমনকি ২০২২ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এই দ্বীপকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভুতুড়ে পুতুলের সংগ্রহশালা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু কেন এই দ্বীপে এত পুতুল? আর কে এই গা–ছমছমে কাণ্ড ঘটিয়েছে?

ডন জুলিয়ানের কীর্তি
পুতুলের দ্বীপের গল্পটি ডন জুলিয়ান সান্তানা বারেরা নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত। তিনি মেক্সিকো সিটির সোচিমিলকো এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মেক্সিকো সিটির ঠিক দক্ষিণে ‘লাগুনা দে তেশুইলো’ নামের সুন্দর একটা লেক আছে। এই লেকের ঠিক মাঝখানে একসময় একটা নামহীন দ্বীপ ছিল। দ্বীপের জমিটি চাষাবাদের জন্য বেশ ভালো ছিল। ১৯৫০ সালের দিকে ডন জুলিয়ান তাঁর স্ত্রী ও পরিবার ছেড়ে এই দ্বীপে একাকী থাকতে শুরু করেন।
ডন জুলিয়ান কেন পরিবার ছেড়ে এই দ্বীপে চলে এসেছিলেন, সেই কারণ অজানা। তবে কিছুদিন পরই বোঝা যায়, তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। দ্বীপে আসার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লেকের পাড়ে এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পান। লেকের পানিতে ভেসে ওঠে এক কিশোরীর মৃতদেহ, যা তিনি নিজেই উদ্ধার করেন। এ ঘটনার কিছুদিন পরই লেকের পানিতে একটি পুতুল ভেসে আসতে দেখেন তিনি। এই সাধারণ পুতুলটিই ডন জুলিয়ানের জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। সেই সঙ্গে বদলে যায় এই দ্বীপের চেহারা।
দ্বীপে একা থাকার সময় ডন জুলিয়ান ভাবতেন, মৃত মেয়েটি হয়তো দ্বীপটিতে ঘুরে বেড়ায়। তাই তার স্মৃতির উদ্দেশে তিনি ভেসে আসা পুতুলটি কুড়িয়ে একটি গাছে ঝুলিয়ে দেন। নিজেকে দ্বীপের কেয়ারটেকার মনে করা এ মানুষটির কাছে কিন্তু একটি পুতুল যথেষ্ট ছিল না। তাঁর মনে হতো, মেয়েটির জন্য আরও পুতুলের প্রয়োজন।

এরপর দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে ডন জুলিয়ান শুধু পুতুলই কুড়িয়েছেন। খালের পানি আর আবর্জনার স্তূপ থেকে পুতুল খুঁজে এনে তিনি দ্বীপের গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখতেন। অনেক পুতুল ছিল ভাঙাচোরা। এগুলোর কোনোটার মাথা ছিল না, কোনোটার হাত-পা ছিল না, আবার কোনোটা ছিল একদম ক্ষতবিক্ষত।
একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে একা একা এমন কাজ করা আসলেই অসম্ভব। আর ঠিক এ কারণেই এই পুতুলের দ্বীপের গল্পটি নিয়ে অনেকের মনেই নানা সন্দেহ রয়েছে। এই পুরো কাহিনির সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, লেকের পানিতে ডুবে মারা যাওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি আসলে বাস্তবে ছিল কি না।

ডন জুলিয়ানের নিজের পরিবারের লোকেরাও বিশ্বাস করতেন না যে তিনি সত্যি কোনো মৃত মেয়েকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি কি গল্পটি বানিয়ে বলেছিলেন? নাকি একাকিত্বের কারণে সবকিছু নিজে নিজেই কল্পনা করেছিলেন? অথবা অন্য কিছুকে ভুল করে মানুষের মৃতদেহ ভেবেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর কখনোই জানা যায়নি।
তবে একটা বিষয় একদম পরিষ্কার। মেয়েটি বাস্তবে থাকুক আর না–ই থাকুক, ডন জুলিয়ান কিন্তু তাঁর জীবনের বাকি সময় তাকে মনে করেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তটিও সেই ডুবে যাওয়া শিশুটির কাহিনির সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল।
এক পুতুল সংগ্রাহকের মৃত্যু
২০০১ সালে ডন জুলিয়ান সান্তানা বারেরা মারা যান। অবাক করার মতো বিষয় হলো, তাঁর মৃতদেহটি ঠিক সেই লেকের পানিতেই ভেসে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল, যেখানে তিনি সব সময় দাবি করতেন তিনি ছোট্ট মেয়েটির লাশ দেখেছিলেন।
ডন জুলিয়ানের এই রহস্যময় মৃত্যুর পর থেকে পর্যটকেরা এই দ্বীপের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। এর পর থেকে সেখানে ভিড় করতে শুরু করেন পর্যটকেরা। তাঁরা আসার সময় সঙ্গে করে নতুন নতুন পুতুল নিয়ে আসতেন। আজও মানুষ ডন জুলিয়ান এবং সেই মৃত মেয়েটির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দ্বীপে পুতুল ঝুলিয়ে দিয়ে যান।

পুতুল দেখে কেন ভয় লাগে
পুতুল দেখে ভয় পাওয়াকে বলা হয় ‘পেডিওফোবিয়া’। পুতুলের মুখে কোনো হাসি বা কান্নার ভাব থাকে না। অথচ এরা মানুষের মতো অপলক তাকিয়ে থাকে। এ অদ্ভুত চাহনির কারণেই মূলত মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি হয়। মেক্সিকোর এই পুতুলের দ্বীপটি যেকোনো সাধারণ মানুষের মনেই চরম অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেন, রাতের বেলা পুতুলগুলো নাকি ফিসফিস করে কথা বলে, শিস দেয় এবং হাত-পা নাড়ায়। তবে এগুলো আসলে কোনো ভুতুড়ে কাণ্ড নয়। রাতের বেলা গাছের ডাল আর পুতুলগুলোর ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার সময় একধরনের শব্দ হয়। মানুষ সাধারণত এই বাতাসের শব্দ শুনেই ভুল বোঝে। আর দ্বীপের ভুতুড়ে গল্প আগে থেকে তাদের জানা থাকায়, সেই শব্দকে তারা পুতুলের শব্দ বলে ধরে নেয়।
