যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। তবে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে ইরান। দেশটির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের শর্ত মেনে নিতে হবে। তা না হলে যুদ্ধের অবসান হবে না, খুলবে না হরমুজ প্রণালিও। এদিকে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কার মধ্যে তেহরানে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের আনাগোনা বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
গতকাল বুধবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেন। সেখানে তিনি যুদ্ধ ও ইয়েমেনের সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেন। অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই এ সফর হলো। এর আগে সোমবার ইরানের রাজধানীতে যান রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। তিনি এর আগের দিন উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এ সপ্তাহে তেহরানে আরো কয়েকজন আরব কর্মকর্তার সফরেরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এসব কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও ইরানের অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস নেই। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ‘এক গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও ইরান থেকে সরানো হবে না।’
তবে ইরানের ভেতরেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানোর সম্ভাবনা নাকচ করেননি তিনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তদারকিতে এ কাজ করা যেতে পারে। এর আগে তেহরান এমন প্রস্তাব দিয়েছিল।
ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর অন্যতম কারণ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প বারবার বলেছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ভেঙে দিতে চান। তবে চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে ওয়াশিংটনের দাবি পূরণ হতে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা অবশ্য পারমাণবিক কর্মসূচিকে দেশটির সার্বভৌম অধিকার ও অর্জন হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, হামলা, নাশকতা ও হত্যাকাণ্ডের পরও কয়েক দশক ধরে এ কর্মসূচি টিকিয়ে রাখা জাতীয় সাফল্য। মঙ্গলবার রেজায়ি একে ‘জাতীয় সম্পদ’ বলে বর্ণনা করেন।
ইরান বেসামরিক কাজেও কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে। এর মধ্যে তেজস্ক্রিয় ওষুধ তৈরি এবং রাশিয়ার সহযোগিতায় বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন রয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের যুক্তি, সামরিক চাপের মুখে পারমাণবিক কর্মসূচি ছেড়ে দেওয়া আত্মসমর্পণের শামিল হবে। এমনকি তাতে ভবিষ্যতে আরও হামলার ঝুঁকি থেকে ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ারও নিশ্চয়তা নেই।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ বহুদিনের। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ধারণা করেছিল, তেহরানের কাছে ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়েছিল। একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।
২০২৫ সালের হামলার পর ২০২৬ সালেও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আরো হামলা চালায়। এতে দেশটির পারমাণবিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইএইএ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করতে না পারায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান পরিমাণ, অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান আইএইএকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। তেহরানের অভিযোগ, বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণ এবং পারমাণবিক বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর মধ্য দিয়ে সংস্থাটি পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থ এগিয়ে নিচ্ছে।
ইরানের কর্মকর্তারা বরাবরই বলে আসছেন, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছেন না। তবে দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা চলতে থাকলে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য হিসেবে থাকার যৌক্তিকতা কী।
যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ছে
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কাও বাড়ছে। এ সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরাইলের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে এসব বৈঠকে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা কমেছে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।
বুধবার তেহরানে ইরানি রপ্তানিকারকদের এক সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান আরো হামলা ও ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে রয়েছে।
আরাগচি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, দেশটি এখন সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে রয়েছে এবং যুদ্ধ চলছে। আমরা শান্তির পরিস্থিতিতে পৌঁছাইনি। বরং তা থেকে অনেক দূরে রয়েছি। তাই সব সিদ্ধান্ত যুদ্ধের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নিতে হবে।’
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে জানানোর মতো ইরানের নতুন কিছু নেই। গত মাসে নিউইয়র্কে দেওয়া শর্তগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সাত দিনের মধ্যে এসব শর্ত পূরণ করা হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রত্যাশা করছে তেহরান।
চলতি সপ্তাহে ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করা মধ্যস্থতাকারীরা তাদের প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তবে তাদের জানানো হয়েছে, ইরানের শর্ত মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আস্থা তৈরি করতে হবে।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাময়িকভাবে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরান ও ওমানের চুক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া।
ওই সমঝোতা স্মারকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর চুক্তির বিষয়ে অবিলম্বে আলোচনা শুরুর অঙ্গীকারও ছিল। এ ছাড়া দক্ষিণ ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় করা এবং লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সামরিক অভিযান বন্ধ করার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক ও মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপ্রধান এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়া ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছাড়তে রাজি হবে না।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তারা আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে।’
গেরানমায়েহ আরো বলেন, ‘এ পর্যায়ে আমরা এ ধরনের আলোচনা থেকে অনেক দূরে রয়েছি।’
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ
কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো মঙ্গলবার নাম প্রকাশ না করা কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, পেন্টাগন ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরির আঘাত হানার দল এবং একটি মেরিন ইউনিট মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে। এতে ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আরো কয়েকটি বিকল্প তৈরি হবে।
গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা ইরানে সম্ভাব্য বিভিন্ন সামরিক অভিযানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা এবং পারমাণবিক ও জ্বালানি স্থাপনায় ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো দখল করা এবং আরো ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যা করার বিষয়ও আগে আলোচনায় এসেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভি বুধবার নাম প্রকাশ না করা এক নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আবার হামলা চালালে কিংবা হত্যাকাণ্ড ঘটালে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা বা সংযম ছাড়াই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা।
গেরানমায়েহ বলেন, ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথিদের বাব আল–মান্দেব প্রণালির আশপাশে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রেও তেহরান সহায়তা করেছে। মার্কিন নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে আগাম হামলার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছে ইরান।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নজর রাখতে হবে, ইসরাইলের নির্বাচন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সামরিক হামলা চালায় কি না।’
ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচেষ্টায় সমর্থন দেওয়ার পর এ আশঙ্কার কথা বলেন তিনি।
এএম
