ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং সচেতনতার অভাবে বর্তমানে চোখের নানা জটিল সমস্যা বাড়ছে। শিশুদের অপরিপক্ক জন্মজনিত চোখের ঝুঁকি থেকে শুরু করে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ছানি, লেন্স ব্যবহারের অপকারিতা ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের সময়-এর সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা । সাক্ষাৎকারে ছিলেন মাহমুদুল হাসান।
আমাদের সময়: চোখের প্রধান সমস্যা এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে কমন চোখের রোগগুলো কী কী?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: বাংলাদেশের সবচেয়ে কমন চোখের রোগ হচ্ছে রিফ্র্যাক্টিভ ত্রুটি বা দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা আর এর পরেই রয়েছে চোখের ছানি। দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা অত্যন্ত প্রাচীন এবং যেকোনো বয়সের মানুষেরই এটি হতে পারে। তবে ইদানিং এই সমস্যা আরও বেশি বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো ডিভাইস বা স্ক্রিনের অতিমাত্রায় ব্যবহার। মানুষ এখন সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত এবং অল্প বয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই রাতে ঘুম না ঘুমিয়ে কিংবা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে লিপ্ত থেকে অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার করায় তাদের দৃষ্টিশক্তি ব্যাহত হচ্ছে।
আমাদের সময়: উচ্চ আলো বা অন্ধকার কি চোখের জন্য ক্ষতিকর?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: মানুষের চোখে আলো অনুযায়ী পিউপিল কনস্ট্রাকশনের ন্যাচারাল মেকানিজম রয়েছে। তবে পড়াশোনা বা কাজের জন্য সবসময় একটি অপটিমাম লাইট বা উপযুক্ত আলো থাকা উচিত। অপটিমাম লাইটে পড়াশোনা না করলে চোখের দৃষ্টিশক্তি ব্যাহত হতে পারে।
আমাদের সময়: দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে কী ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ন্যাচারাল ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যায়। এতে একদিকে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, অন্যদিকে চোখ ড্রাই হয়ে যায়। মানুষের চোখে নির্দিষ্ট সময় পরপর অটোমেটিক ব্লিংকিং বা পলক পড়ার যে রিফ্লেক্স রয়েছে, তা অবাক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে ব্যাহত হয়। এর ফলে চোখ ড্রাই ও খচখচ করা, দৃষ্টি কমে যাওয়া এবং ডিসকমফর্টের কারণে মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম ও কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়।
আমাদের সময়: জন্মের পর থেকেই কি শিশুর চোখের পরীক্ষা করার প্রয়োজন আছে?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: নরমাল ডেলিভারির পাশাপাশি বর্তমানে অনেক প্রিটর্ম বা অপরিপক্ক শিশুও জন্মগ্রহণ করে, যাদের জীবন রক্ষার্থে আগে সিজার করতে হয়। স্বাভাবিক সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের পাশাপাশি প্রিটর্ম শিশুদের চোখ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। মায়ের উচিত বাচ্চা তাকে ডাকলে ঘুরে তাকায় কিনা, ফলো করছে কিনা বা উজ্জ্বল আলো ও রঙের দিকে তাকাচ্ছে কিনা তা খেয়াল করা। কোনো সমস্যা দেখলে নিকটস্থ চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে। বিশেষ করে অপরিপক্ক বা কম ওজনের শিশুদের জন্মের তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে, কারণ তাদের রেটিনায় পরবর্তীতে পার্মানেন্ট অন্ধত্বের মতো মারাত্মক ও অকিউরেবল সমস্যা তৈরি হতে পারে।
আমাদের সময়: ডায়াবেটিসের সাথে চোখের কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: ডায়াবেটিসের সঙ্গে চোখের শতভাগ সম্পর্ক রয়েছে। শরীরে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা ব্লাড সুগার বেশি থাকলে চোখ, কিডনি ও মস্তিষ্কের ছোট ছোট রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে রক্তক্ষরণ, হিমোরেজ এবং রেটিনা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে এক কোটির বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং তাদের চোখ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো ডায়াবেটিক রোগীর চোখে সমস্যা থাকুক বা না থাকুক, বছরে অন্তত দুইবার (সমস্যা না থাকলেও প্রতি ছয় মাসে) নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা উচিত।
আমাদের সময়: সৌন্দর্যের জন্য চোখের লেন্স ব্যবহারের কোনো ক্ষতি বা ঝুঁকি আছে কি?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: লেন্স ব্যবহার করা নিয়ে আমার কিছুটা প্রেজুডিস রয়েছে এবং আমি সচরাচর পেশেন্টদের লেন্স ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করি। চোখ এমনিতেই অনেক সুন্দর, তাই অতিরিক্ত নীল বা সবুজ লেন্স পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কন্টাক্ট লেন্স খোলার পর সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ফেলে দিতে হয়, কিন্তু মানুষ বছরের পর বছর তা ব্যবহার করে। এছাড়া অনেকে ট্যাপের পানি বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে লেন্স পরিষ্কার করেন, যা থেকে মারাত্মক রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। এমনকি বিদেশ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড লেন্স আসার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে সারাদিন লেন্স পরে থাকার কারণে ‘স্যাটারডে মর্নিং’ এ আমাদের চেম্বারে প্রচুর রোগী আসেন যাদের চোখের মনি অ্যাব্রেশন বা মারাত্মক প্রদাহ নিয়ে চোখ ফুলে অন্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়।
আমাদের সময়: ছানি বা ক্যাটারেক্ট হওয়ার প্রধান কারণ কী? এটি কি শুধু বেশি বয়সেই হয়?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: ২০২০ সালের ন্যাশনাল ব্লাইন্ডনেস সার্ভে অনুযায়ী ছানিই হলো বাংলাদেশে ম্যাক্সিমাম মানুষের অন্ধত্ব বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর সবচেয়ে বড় কারণ। বয়স বাড়লে মানুষের চুল পাকে, ত্বকে পরিবর্তন আসে, তেমনি চোখের লেন্সেরও বয়স হয় এবং তা আস্তে আস্তে ঘোলা হয়ে যায় এটাই মূলত ছানি। বয়স ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন ক্রনিক ডিজিজ যেমন-ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের কারণেও অল্প বয়সে ছানি পড়তে পারে। তবে ন্যাচারাল এজিংয়ের কারণে হওয়া ছানি একমাত্র অপারেশনের মাধ্যমেই নিরাময় করা সম্ভব, অপারেশন ছাড়া এর অন্য কোনো পদ্ধতি নেই।
আমাদের সময়: চোখ ওঠা বা কনজাংটিভাইটিস হলে কী করণীয় এবং এটি কেন হয়?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: কনজাংটিভাইটিস অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা এখন আর শুধু শীতের আগে-পরে সীমাবদ্ধ নেই বরং ঢাকা শহরের মতো বড় শহরে খুব দ্রুত ছড়ায় এবং সারা বছরই এর রোগী পাওয়া যায়। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ধুলাবালুর কারণে এলার্জিক কনজাংটিভাইটিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আমাদের সময়: চোখ ভালো রাখতে প্রাথমিক কী পরীক্ষা বা নিয়মিত চেকআপের প্রয়োজন রয়েছে?
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: চোখ ভালো রাখতে কিছু স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম মেনে চলা উচিত। কোনো শিশু স্কুলে যাওয়ার আগে কাছ থেকে টিভি দেখলে বা স্কুলে গিয়ে ক্লাসের বোর্ড পরিষ্কার দেখতে না পেলে তাকে দ্রুত চোখের ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এছাড়া স্কুলগামী শিশু এবং চল্লিশোর্ধ্ব যেকোনো মানুষের নিয়মিত বছরে অন্তত একবার চোখের ডাক্তার দেখানো বাধ্যতামূলক। অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তির সময়ও আই সার্টিফিকেট চাওয়া হয়। ডাক্তার মূলত দৃষ্টিশক্তি (ভিশন), রং চেনার ক্ষমতা এবং চোখে ট্যারাপনা বা অন্য কোনো ভিজিবল সমস্যা আছে কিনা তা পরীক্ষা করেন। স্ক্রিন ল্যাম্প, অটো রিফ্রেক্টোমিটার এবং পোস্ট্রিওর সেগমেন্ট দেখার আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে এই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা হয়।
ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা: চোখ ভালো রাখতে কিছু স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম মেনে চলা উচিত। কোনো শিশু স্কুলে যাওয়ার আগে কাছ থেকে টিভি দেখলে বা স্কুলে গিয়ে ক্লাসের বোর্ড পরিষ্কার দেখতে না পেলে তাকে দ্রুত চোখের ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এছাড়া স্কুলগামী শিশু এবং চল্লিশোর্ধ্ব যেকোনো মানুষের নিয়মিত বছরে অন্তত একবার চোখের ডাক্তার দেখানো বাধ্যতামূলক। অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তির সময়ও আই সার্টিফিকেট চাওয়া হয়। ডাক্তার মূলত দৃষ্টিশক্তি (ভিশন), রং চেনার ক্ষমতা এবং চোখে ট্যারাপনা বা অন্য কোনো ভিজিবল সমস্যা আছে কিনা তা পরীক্ষা করেন। স্ক্রিন ল্যাম্প, অটো রিফ্রেক্টোমিটার এবং পোস্ট্রিওর সেগমেন্ট দেখার আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে এই পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা হয়।
