সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট-এর (এসআরএফটিআই) পাশে থাকার আহ্বান জানালেন প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। শনিবার সকালে এক ভিডিয়ো বার্তায় অভিনেতা দাবি করেন, সারা দেশ জুড়েই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভয় দেখিয়ে বা মগজধোলাই করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে শাসকেরা। সেখানেই সংঘাত এসআরএফটিআই-এ। সে জন্যই পড়ুয়াদের পাশে থাকতে হবে বলে দাবি তাঁর।
এ দিকে, আগামী ২৭ অক্টোবর থেকে দেশ জুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়াদের একাংশ। গত ২৭ সেপ্টেম্বরই কলকাতা ক্যাম্পাসে গোলমাল শুরু হয়। ওই দিন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র সংঘর্ষ পরিস্থিতি শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে বহিরাগতেরা পড়ুয়াদের মারধর করেছেন। পাল্টা অভিযোগ তোলে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতও। পরে, ৪ অক্টোবর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও এক দফায় ক্যাম্পাসে হামলা চালান বহিরাগতেরা, অভিযোগ এমনই।
এর পরই অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন পড়ুয়াদের একাংশ। তাঁদের দাবি ছিল, প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে যে সব মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিবৃতি জারি করতে হবে এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষকে। বহিরাগতদের হামলার প্রতিবাদ করার ফলে উল্টে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন পড়ুয়ারা।
পড়ুয়াদের অভিযোগ, গোটা ঘটনায় কর্তৃপক্ষ যা যা পদক্ষেপ করেছেন তা সন্তোষজনক নয়। বরং, উপাচার্যের সন্তোষ অজমেরার আচরণ পড়ুয়া স্বার্থের বিরোধী। তাই গত সপ্তাহে তাঁরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। এরই মধ্যে কড়া হয়েছেন কর্তৃপক্ষ। গত শুক্রবার, দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় হঠাৎই নির্দেশিকা জারি করে পড়ুয়াদের ক্যাম্পাস খালি করতে বলেন কর্তৃপক্ষ। পুজোর ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। হস্টেল ও মেস বন্ধ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।
কিন্তু ক্যাম্পাস ছাড়তে নারাজ পড়ুয়ারা। তাঁরা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন শনিবার পর্যন্ত। যদিও অভিযোগ, ক্যাম্পাসে জলের সংযোগও নেই। এই পরিস্থিতিতে ২৭ অক্টোবর থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন তাঁরা। সেখানেই পাশে দাঁড়িয়েছেন নাসিরুদ্দিন শাহ। এর আগে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনেও সামিল হয়েছিলেন নাসিরুদ্দিন, শবানা আজ়মি-সহ বলিউডের অন্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। এ বার সব নজর কলকাতায়।
শনিবারের ভিডিয়ো বার্তায় নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘‘দেশের ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের হয় ভয় দেখিয়ে, নয়তো মগজধোলাই করে নিজেদের অনুগত করতে চাইছে বিজেপি। এসআরএফটিআই-এর ছাত্রছাত্রীরা এই প্রতিহিংসারই শিকার। অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি দাবি করায় তাঁদের শোকজ় নোটিস দেওয়া হয়েছে। নজরদারিতে রাখার পাশাপাশি হুমকিও দেওয়া হয়েছে।’’ হস্টেল ছাড়ার নির্দেশেরও বিরোধিতা করেন তিনি। বিজেপি এখন তাদের মতাদর্শ ও নীতির বিরোধিতা করা মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে বলে জানান ওই অভিনেতা। এই পরিস্থিতিতে বিবেকবান নাগরিকদের এসআরএফটিআই পড়ুয়াদের পাশে থাকার আহ্বান জানান নাসিরুদ্দিন।
শনিবারই এসআরএফটিআই-এ ছাত্র সংসদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেরুয়াকরণ এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করার বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ক্যাম্পাস আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তাঁরা। আগামী ২৭ অক্টোবর, মঙ্গলবার, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একযোগে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার রক্ষা, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং ছাত্রছাত্রীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিতেই এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছে ছাত্র সংসদ।
শুধু এসআরএফটিআই নয়। গত কয়েক মাসে দেশের একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসআরএফটিআই ছাত্র সংসদের দাবি, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, আইআইটি বম্বে, আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পণ্ডিচেরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। বরং এই ঘটনাগুলি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার এবং ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ। এই তালিকারই সংযোজন এসআরএফটিআই।
ছাত্রদের একাংশের অভিযোগ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির ক্যাম্পাসে প্রবেশ এবং প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ফলে শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীন পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
শনিবার ভিডিয়ো বার্তাতেও নাসিরুদ্দিন জানান, তিনি নিশ্চিত, ভয় দেখিয়ে বা মগজধোলাইকরে বিজেপি যে ভাবে ছাত্রছাত্রীদের অনুগত করার চেষ্টা করছে সেই চেষ্টা সফল হবে না। তাঁর কথায়, ‘‘এই তরুণরাই ভবিষ্যতে নিজেদের, আমাদের দেশ এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতির সত্যিটা তুলে ধরবেন।’’ এই প্রেক্ষিতে এসআরএফটিআই ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি শুভম বলেন, ‘‘পাশে থাকার যে বার্তা দিয়েছেন প্রবীণ অভিনেতা, আমাদের খুব ভাল লেগেছে। আমরা সকলের থেকে আরও সংহতি আশা করছি।’’
মূলত দশ দফা দাবিতে আন্দোলনে নামছেন এসআরএফটিআই পড়ুয়ারা। তার মধ্যে যেমন রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গেরুয়াকরণ বন্ধ, প্রতিবাদ করার জন্য শাস্তির মুখে পড়া পড়ুয়াদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, তেমনই রয়েছে বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০ প্রত্যাহারের দাবিও।
এসআরএফটিআই-এর পড়ুয়া সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, “দেশের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও পড়ুয়াদের এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কোনও ভাবেই প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আন্দোলনকে এক ছাতার তলায় এনে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তোলাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।” তাঁদের দাবি, শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীন চিন্তা এবং মতপ্রকাশের পরিসর রক্ষার লড়াইয়ে দেশ জুড়ে ছাত্রসমাজকে একজোট হয়ে লড়াই করতে হবে।
