শাহ তানভীর আহমেদ।।
গরমে কিংবা অসুস্থতায় তৃষ্ণা মেটাতে রাস্তার পাশের ডাবের দোকানে থামা একসময় খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। শরীর সতেজ রাখতে কিংবা রোগীর জন্য অনেকেই ডাবের পানি কিনতেন। কিন্তু খুলনায় সেই পরিচিত দৃশ্য এখন বদলে গেছে।
শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে সবখানে একটি ডাবের দাম উঠেছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়-দাম শুনেই অনেক ক্রেতাকে খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। উৎপাদন বা উপকূলীয় এলাকা থেকে খুলনার পাইকারি ও খুচরা বাজারে আসতে কয়েক ধাপে বাড়ছে দাম, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ। ফলে তৃষ্ণা মেটানোর সহজলভ্য প্রাকৃতিক পানীয় ডাবের পানি এখন খুলনার সাধারণ মানুষের কাছে বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবার ও ডেঙ্গুতে অসুস্থ স্বজনের জন্য ডাব কিনতে আসা মানুষকে পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে। প্রশ্ন উঠছে, উপকূলীয় উৎপাদন এলাকা থেকে খুলনার বাজারে পৌঁছাতে একটি ডাবের দাম এতটা বাড়ছে কেন?
বুধবার (২১ অক্টোবর) নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি পিস ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়।
দাম শুনেই পিছিয়ে যাচ্ছেন ক্রেতারা: ডাব কিনতে এসে দাম শুনে থমকে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই। সীমিত আয়ের মানুষের কাছে প্রতিদিনের সংসার খরচ সামলানোই যখন কঠিন, তখন একটি ডাবের জন্য শতাধিক টাকা ব্যয় করাকে অনেকেই বিলাসিতা মনে করছেন। বিশেষ করে পরিবারের শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা অসুস্থ কারো জন্য ডাব কিনতে হলেও বাড়তি খরচের হিসাব মাথায় রাখতে হচ্ছে।
খুলনার নিউমার্কেট এলাকায় ডাব কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সামছুল আলম বলেন, আগে মাঝেমধ্যে ডাব কিনতাম। এখন দাম শুনলে আর কিনতে ইচ্ছা করে না। প্রয়োজন হলেও প্রতিদিন কেনা সম্ভব নয়। সংসারের অন্য খরচের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে হয়।
একই এলাকার আরেক ক্রেতা তানিয়া আক্তার বলেন, পরিবারের অনেকেই ডেঙ্গু জ্বরে অসুস্থ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডাব কিনতে হয়। কিন্তু বর্তমানে ডাবের যে দাম, তাতে নিয়মিত কেনা বেশ কঠিন। আগে প্রয়োজন হলে সহজেই ডাব কেনা যেত, এখন একবার ডাব কিনতে গেলেও সংসারের অন্যান্য খরচের হিসাব করতে হয়। বাধ্য হয়ে অন্য বাজার খরচ কমিয়ে ডাব কিনতে হচ্ছে।
উৎপাদন এলাকা থেকে খুলনা, ধাপে ধাপে বাড়ছে দাম: ডাবের দাম কেন এত বেশি- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে উৎপাদন এলাকা থেকে খুলনার খুচরা বাজার পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। খুলনার আশপাশের উপকূলীয় জেলা ও ডাবের ফলন এলাকা থেকে বিভিন্ন হাত ঘুরে ডাব আসে শহরে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ডাব পৌঁছায় ভোক্তার কাছে।
এই দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি, ওঠানো-নামানো, সংরক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ। এসব ব্যয় বিক্রয়মূল্যে যুক্ত হলে উৎপাদন এলাকায় তুলনামূলক কম দামে কেনা ডাব খুলনার বাজারে এসে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়।
পাইকারি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উৎপাদন এলাকা থেকে খুলনার খুচরা বাজারে পৌঁছাতে ডাবের দাম কয়েক ধাপে বাড়ে। উৎপাদন এলাকায় গাছমালিকের কাছ থেকে একটি ডাব ৬০–৭০ টাকায় সংগ্রহ করা হলেও পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও আড়ত খরচ যুক্ত হয়ে পাইকারি বাজারে দাম দাঁড়ায় প্রায় ৯০–১০০ টাকা। এরপর দোকানভাড়া, অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ও মুনাফা যোগ করে খুচরা বাজারে একই ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৫০–২০০ টাকায়। ফলে প্রাথমিক সংগ্রহমূল্যের তুলনায় ক্রেতাকে ৮০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে।
বিক্রেতাদের বাড়তি খরচের হিসাব: খুলনার ডাবের দোকানে ক্রেতারা যখন দাম শুনে পিছিয়ে যাচ্ছেন, তখন বিক্রেতাদেরও প্রতিদিনের কেনাবেচার হিসাব মেলাতে হচ্ছে। তাদের দাবি, ডাব কেনা থেকে শুরু করে পরিবহন, দোকানভাড়া ও শ্রমিকের মজুরিসহ বিভিন্ন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর বেশি দামে ডাব বিক্রি করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘ পার্ক এলাকার একজন ডাব ব্যবসায়ী বলেন, আমরা পাইকারি বাজার থেকে যে দামে ডাব কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও দোকানভাড়া যোগ করতে হয়। পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকলে খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা যখন দাম শুনে কিনতে চান না, তখন আমাদেরও লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়।
ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে ডাবের চাহিদা, তবে বিকল্প নয়: ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। একইভাবে ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগেও শরীর থেকে প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান বেরিয়ে যায়। এ কারণে তরল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে এবং প্রাকৃতিক পানীয় হিসেবে ডাবের পানির প্রতি আগ্রহ বাড়ে। তবে চাহিদা থাকলেও ডাবের উচ্চমূল্য অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়েছে।
পুষ্টিবিদদের মতে, ডাবের পানিতে পটাশিয়ামসহ কিছু প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান রয়েছে, যা শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। তবে ডাবের পানি সব ধরনের পানিশূন্যতা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতায় খাবার স্যালাইন (ওআরএস) বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডাবের পানিকে কোনো রোগের চিকিৎসা কিংবা খাবার স্যালাইনের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
দাম নাগালে আনতে দরকার বাজারের স্বচ্ছতা: ডাবের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে হলে উৎপাদন এলাকা থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি ধাপ পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হলে তার চাপ ভোক্তার ওপর পড়ে। তাই নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে প্রকৃত খরচ খতিয়ে দেখা দরকার, যাতে খুলনার সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে ডাব কিনতে পারেন।
