সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হুথিদের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশটির আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান-সমর্থিত হুথিদের মোকাবিলায় ইসরাইলের সঙ্গে সীমিত নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় আসছে। তবে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এখনো বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
মুসলিম বিশ্বে ফিলিস্তিন প্রশ্নের গুরুত্ব এবং সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি জটিল। সৌদি নেতৃত্বও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অগ্রগতিকে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে।
নিরাপত্তার চাপে সৌদি আরব
সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইয়েমেনভিত্তিক এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে সৌদি আরবের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ও লোহিত সাগরের বন্দরগুলোর গুরুত্ব বেড়ে যায়। এসব অবকাঠামো বা নৌপথে হামলার ঝুঁকি তৈরি হলে দেশটির তেল রপ্তানি ও অর্থনীতিতে চাপ পড়তে পারে।
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথিদের সামরিক তৎপরতা মোকাবিলায় সৌদি আরবের প্রয়োজন হতে পারে উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা। এসব ক্ষেত্রে ইসরাইলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকায় দুই দেশের স্বার্থের সম্ভাব্য মিল নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেই যে সৌদি আরব ইসরাইলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে ইসরাইল?
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আঞ্চলিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সরাসরি ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সৌদি আরবকে বিকল্প সহযোগিতার পথ বিবেচনা করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসরাইল ছাড়াও পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সৌদির কৌশলের অংশ হতে পারে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, তুরস্কেরও প্রতিরক্ষা শিল্প ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে রিয়াদকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
ইসরাইলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা পুরোপুরি ইসরাইল নিতে পারবে—এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বড় বাধা ফিলিস্তিন প্রশ্ন
ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রকাশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিন ইস্যু। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসযোগ্য ও সুস্পষ্ট পথ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নে ইসরাইলের অবস্থান দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ জনমত এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে নিরাপত্তার প্রয়োজনে দুই দেশের মধ্যে সীমিত সহযোগিতা বাড়লেও তা দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকাশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পরিবর্তে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ইস্যুতে পরোক্ষ যোগাযোগ বা সীমিত সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে সৌদি আরব?
সৌদি আরবের সামনে এখন একাধিক বিষয় বিবেচনার রয়েছে—হুথিদের সামরিক হুমকি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির ঘোষিত অবস্থান।
এসব বিষয় বিবেচনায় ইসরাইলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে এবং পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হলেও সৌদি আরব কি নিরাপত্তার স্বার্থে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করবে, নাকি ফিলিস্তিন প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখে বিকল্প আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর নির্ভর করবে?
