দিনভর যানবাহনের ব্যস্ততা। কখনো যাত্রীবাহী বাস, কখনো মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেটকার—সঙ্গে পণ্যবাহী যান ও সিএনজি অটোরিকশার অবিরাম চলাচল। পূর্ব সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগস্থল বিয়ানীবাজারের চারখাই বাজারের চেনা এই দৃশ্যের আড়ালেই যেন বদলে যাচ্ছে আরেকটি চিত্র।
সীমান্তপথে আসা ইয়াবার চালান এখন চারখাই হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের নজরদারি এবং নিয়মিত টহল থাকলেও মাদক প্রবেশ পুরোপুরি থামছে না। বরং সাম্প্রতিক সময়ে চারখাইকে ঘিরে ইয়াবা পাচারের তৎপরতা বাড়ার অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় সামনে এসেছে চারখাইয়ের এই নতুন বাস্তবতা। ফলে স্থানীয়দের অনেকের কাছে এখন প্রশ্ন—ব্যস্ত এই জনপদ কি ধীরে ধীরে ইয়াবা পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘করিডোর’ হয়ে উঠছে?
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে শুধু চারখাই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২৫ হাজারের বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। পৃথক অভিযানে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিরা সবাই সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।
চারখাই পুলিশ ফাঁড়ির সামনের চেকপোস্টে যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালানোর সময় এসব ইয়াবার চালান জব্দ করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় এই রুটে ভারতীয় চিনি, জিরা, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্যের প্রবণতাই বেশি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইয়াবা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চারখাই পূর্ব সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজারের একটি বড় অংশের মানুষ এই পথ দিয়ে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। আর যোগাযোগব্যবস্থার এই সুবিধাকেই পাচারকারীরা কাজে লাগাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চারখাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন মুরাদ চৌধুরী বলেন, মাদকের কারণে যুব সমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদক পাচার ও বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল কবির বলেন, চারখাই এলাকায় নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনার পাশাপাশি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। আগে এই রুটে চোরাই পণ্য বেশি ধরা পড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে মাদক পাচারের প্রবণতা বেড়েছে।
জকিগঞ্জ-বিয়ানীবাজার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) স্যামুয়েল সাংমা বলেন, গত দেড় থেকে দুই মাসে প্রায় দুই কোটি টাকার মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে। সীমান্তের মূল দায়িত্ব বিজিবির। জকিগঞ্জ সীমান্তের বড় একটি অংশ নদীপথ হওয়ায় মাদক সহজে দেশে প্রবেশের সুযোগ পায়। তবে দেশের অভ্যন্তরে এসব মাদক ও চোরাই পণ্য পরিবহন বন্ধে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হলেও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পর তা দেশের অভ্যন্তরে কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, সেই নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চারখাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে মাদক পরিবহনের রুট ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
