মানুষ অবকাশকেন্দ্রে যায় নিরাপদে ভ্রমণ, পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দময় সময় কাটানো এবং কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে। সেখানে যদি বিনোদনের আড়ালে মৃত্যুফাঁদ পাতা থাকে, যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে মানুষ নিরাপদে চলাচল করবে কোথায়? কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু এই প্রশ্নকে ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার খবরও এসেছে। এটি কেবল একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি, আইন প্রয়োগ ও জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও লাইসেন্স ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিদর্শন, সতর্কবার্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়? বিপদের পূর্বসংকেত জেনেও কোনো স্থাপনা চালু থাকলে এবং সেখানে প্রাণহানি ঘটলে, দায় নির্ধারণের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না; তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের অবহেলা কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে পর্যটন ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদনকেন্দ্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, কোটি কোটি টাকার ব্যবসাও চলছে। অথচ নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যবসার অধিকার আছে, কিন্তু মানুষের জীবন বিপন্ন করে ব্যবসা চালানোর অধিকার কারও নেই। পর্যটকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সময় সেবা ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, অথচ জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর ব্যবস্থা থাকবে না- এমন দ্বিমুখী আচরণ বন্ধ করতেই হবে।
এ জন্য পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে পৃথক, সমন্বিত ও কঠোর পর্যটন নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে হবে। রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অবকাশকেন্দ্রের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকি নিরূপণ এবং অনিয়মের শাস্তি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সংস্কৃতি পরিহার করে সংশোধন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক নজরদারি চালাতে হবে। নিয়ম ভাঙলে মালিকপক্ষের পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সতর্কবার্তার পর গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে নিরপেক্ষ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্ত জরুরি। তদন্তের ফল প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সুপারিশ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের সব পর্যটন এলাকায় জরুরি নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
মানুষের জীবন কোনো ব্যবসায়িক হিসাবের নগণ্য অঙ্ক নয়। অবকাশকেন্দ্র হবে স্বস্তি ও নিরাপত্তার জায়গা, মৃত্যুফাঁদ নয়। সতর্কবার্তা উপেক্ষার পর প্রাণহানির দায় যদি যথাযথভাবে নির্ধারিত না হয়, তবে নিয়মভঙ্গকারীরা আরো বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পাবে। তাই আর আশ্বাস নয়, চাই কার্যকর পদক্ষেপ; আর কাগুজে সতর্কতা নয়, চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ। মানুষের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে-নিরাপত্তার প্রশ্নে অবহেলা ও অনিয়মের কোনো ছাড় নেই।
সানা/আপ্র/১৯/১০/২০২৬
