মানুষের জীবনে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। কখনো সুস্থতার জন্য, কখনো বিপদ থেকে মুক্তির জন্য, কখনো জীবিকার প্রশস্ততা কিংবা মনের কোনো আশা পূরণের জন্য মানুষ মহান আল্লাহর দরবারে হাত তোলে। তাইতো আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলে দাও) নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দেই। সুতরাং তারা যেন আমারে ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।’(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৬)
তাই কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আমলের কথা এসেছে, যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে কবুলের বিশেষ আশা করা যায়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাতটি আমল তুলে ধরা হলো।
১. ঘুম থেকে জেগে নির্দিষ্ট জিকির ও দোয়া পাঠ করা
রাতের ঘুম শেষে নতুন একটি সকাল পাওয়া মহান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে নিম্নে বর্ণিত জিকিরগুলো পাঠ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং এরপর দোয়া করলে তার দোয়া কবুল করা হয়। অতঃপর সে অজু করে নামাজ আদায় করলে তার নামাজও কবুল হয়।
জিকিরটি হলো-لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। সুবহানাল্লাহি, ওয়ালহামদু লিল্লাহি, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার। ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আল্লাহুম্মাগফির লি।
অর্থ : একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ পবিত্র-মহান। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া গুনাহ থেকে বাঁচার কোনো উপায় এবং নেক কাজ করার কোনো শক্তি নেই। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৪)
২. ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পাঠ করা
বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে মুমিনের অন্যতম আশ্রয় হলো মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা। এ ক্ষেত্রে হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন মাছের পেটে গভীর অন্ধকারে অবস্থান করছিলেন, তখন মহান আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাঁকে সেই বিপদ থেকে মুক্তি দেন। দোয়াটি হলো,
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ : লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায-যালিমিন।
অর্থ : আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র-মহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। ((সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৮৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইউনুস (আ.)-এর এই দোয়ার মাধ্যমে কোনো মুসলিম কোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)
৩. ইসমে আজমের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া করা
আল্লাহ তাআলার সুন্দর নামগুলো তাঁর অসীম ক্ষমতা, মহত্ত্ব, দয়া ও গুণাবলির পরিচয় বহন করে। এসব নামের মাধ্যমে তাঁকে ডাকা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা করা দোয়া কবুলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। হাদিসে এমন কিছু দোয়া বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোতে আল্লাহর এমন মহান নামের উল্লেখ রয়েছে, যার মাধ্যমে তাঁকে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে নিম্নে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে শুনে বলেন, সে আল্লাহর এমন মহান নামের মাধ্যমে তাঁকে ডেকেছে, যার মাধ্যমে ডাকা হলে তিনি সাড়া দেন এবং প্রার্থনা করা হলে দান করেন। দোয়াটি হলো,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ، الْمَنَّانُ، يَا بَدِيعَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদু, লা ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহদাকা লা শারিকা লাক, আল-মান্নানু, ইয়া বাদিআস-সামাওয়াতি ওয়াল আরদি, ইয়া যাল-জালালি ওয়াল ইকরাম, ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম, ইন্নি আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযু বিকা মিনান-নার।
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই। আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। আপনি একক, আপনার কোনো শরিক নেই। আপনি মহান দানশীল। হে আসমান ও জমিনের অভিনব স্রষ্টা! হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী! হে চিরঞ্জীব, হে সমস্ত সৃষ্টির ধারক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৯৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৪)
৪. বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে সওয়াব ও উত্তম প্রতিদান চাওয়া
জীবনে বিপদ-আপদ, প্রিয়জন হারানো, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো দুঃখজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া মানুষের জন্য কঠিন পরীক্ষা। এমন সময় মুমিন হতাশ হয়ে পড়ে না; বরং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর কাছে উত্তম প্রতিদান কামনা করে। হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম বিপদে আক্রান্ত হলে আল্লাহর নির্দেশিত দোয়া পাঠ করে উত্তম প্রতিদান চাইলে আল্লাহ তাকে সেই বিপদের বিনিময়ে উত্তম কিছু দান করেন। উম্মে সালামা (রা.) তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.)-এর মৃত্যুর পর এই দোয়া পাঠ করেছিলেন। পরে আল্লাহ তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো উত্তম স্বামী দান করেন।
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
উচ্চারণ : ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহুম্মা আজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়াখলুফ লি খাইরাম মিনহা।
অর্থ : নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮)
৫. বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা
আল্লাহর জিকির হলো মুমিনের হৃদয়কে জীবিত রাখার অন্যতম মাধ্যম। জিকিরের মাধ্যমে বান্দা তার প্রতিপালককে স্মরণ করে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রকাশ করে এবং তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। যে ব্যক্তি নিয়মিত আল্লাহর জিকির করে, তার অন্তর আল্লাহমুখী হয় এবং দোয়া করার সময়ও তার মনে আল্লাহর প্রতি গভীর নির্ভরতা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১)
অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)
অতএব, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং ইস্তিগফারের মতো জিকির নিয়মিত পাঠ করা উচিত। পাশাপাশি সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াগুলো আমল করা যেতে পারে।
৬. কোরআন তিলাওয়াত করা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা
পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর বাণী। এটি মানুষের জন্য হেদায়েত, রহমত ও উপদেশের উৎস। কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর বাণী পাঠ করে, তাঁর নির্দেশনা সম্পর্কে চিন্তা করে এবং নিজের জীবনকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করার প্রেরণা লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি কোরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮২)
কোরআন তিলাওয়াতের পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা, হেদায়েত, কল্যাণ ও জান্নাত কামনা করে দোয়া করা একটি সুন্দর আমল। বিশেষত কোরআনের যেসব আয়াতে নবী-রাসুল ও নেক বান্দাদের দোয়া বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো অর্থসহ পাঠ করে নিজের জীবনে সেই দোয়াগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত।
৭. জমজমের পানি পান করে দোয়া করা
পবিত্র জমজমের পানি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত এই বরকতময় পানির সঙ্গে হজরত ইসমাইল (আ.) ও তাঁর মা হজরত হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। আল্লাহর অসীম কুদরতে সৃষ্টি হওয়া জমজমের পানি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জমজমের পানির ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা পূরণের জন্যই। (সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩০৬২)
এই হাদিসের আলোকে জমজমের পানি পান করার সময় আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া করা, কল্যাণকর উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা এবং নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা উত্তম। কেউ সুস্থতা, ইলম, নেক আমল, ক্ষমা কিংবা দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ চাইতে পারেন।
