১৫ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ১৫ মিনিট আগে
সোহরাব হাসান
সৈয়দ আবুল মকসুদ। ছবি: কোয়ান্টাম মেথডের কসমস স্কুলের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক। তার লেখায় সমকালীন রাজনীতি, সমাজ ও ইতিহাসের নিবিড় অনুসন্ধান লক্ষ্য করা যায়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, খায়রুন্নেসা খাতুন থেকে হরিশচন্দ্র মিত্র—বিচিত্র বিষয়ে তার অভিনিবেশ ছিল। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা শুরু নব্বই দশকের শেষ দিকে। তিনি তখন তখন সরকারি বার্তাসংস্থা বাসসের উপবার্তা সম্পাদক। আমি কাজ করতাম সংবাদে। কাছাকাছি অফিস হওয়ায় মাঝে মাঝে দেখা হতো। একবার তার সঙ্গে কলকাতার একটি সম্মেলনেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
সরকারি বার্তাসংস্থায় কাজ করেও তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেন এবং লিখতেন। ২০০৪ সালের ১ মার্চ প্রথম আলোতে ‘হুমায়ুন আজাদের ওপর আঘাত—ফ্যাসিবাদের নগ্নরূপ’ শীর্ষক তার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে এ ধরনের লেখা ভবিষ্যতে আর না লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এমন নির্দেশনা তার কাছে অবমাননাকর মনে হয়। তিনি বাসস থেকে পদত্যাগ করে স্বাধীনভাবে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাকে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা শুরু করে, সৈয়দ আবুল মকসুদ তার প্রতিবাদ করেন অভিনব পন্থায়। তিনি শপথ নিলেন, যতদিন ইরাকে আগ্রাসী বাহিনী থাকবে, তত দিন পশ্চিমাদের উদ্ভাবিত সেলাই করা কাপড় পরবেন না। সেই থেকে সেলাইবিহীন ধবধবে সাদা কাপড় পরতেন তিনি। ঘরে-বাইরে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় তার পরনে সেই পোশাকই শোভা পেত। পরনের পোশাককে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছিলেন সদ্বিবেচক এই লেখক।
চাকরি ছাড়ার পর সৈয়দ আবুল মকসুদ প্রথম আলোতে ‘সহজিয়া কড়চা’ ও ‘বাঘা তেঁতুল’ নামে দুটি কলাম লিখতেন এবং তা বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করে। পত্রিকায় কলাম লেখার অনেক আগেই তিনি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রবন্ধ, গবেষণা, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা—সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তার স্বাচ্ছন্দ্য পদচারণ ছিল না।
সৈয়দ আবুল মকসুদ একসময় বামপন্থী রাজনীতি করতেন। আমাদের এখানে বাম রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হলো ‘যে যত কড়া, সে তত গোঁড়া’। মকসুদ ভাইয়ের মধ্যে কোনো গোঁড়ামি বা সংকীর্ণতা ছিল না। মাওলানা ভাসানীর অনুসারী ছিলেন। তার জীবনী ছাড়াও কাগমারী সম্মেলন নিয়ে আলাদা বই লিখেছেন। তাই বলে জাতীয়তাবাদী নেতাদের অবদানকে খাটো করে দেখেননি। ইতিহাসে, রাজনীতিতে যার যা প্রাপ্য, তা দিয়েছেন। বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকদের বেশিরভাগই দলীয় বৃত্তে বন্দি এবং ক্ষমতাসীনদের নামে জয়ধ্বনি দিতে উদগ্রীব। অনেকে ব্যক্তিস্বার্থে সরকারের অন্যায় কাজের সাফাই গাইতেও দ্বিধা করেন না। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদ বরাবর সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালোই বলতেন কারও প্রতি কঠোর ভাষা ব্যবহার না করেই। তার লেখায় আবেগ ও গালাগালের চেয়ে যুক্তি ও তথ্য প্রাধান্য পেত। এটাও তার কলাম জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ।
তবে সৈয়দ আবুল মকসুদ শুধু লেখার মধ্যেই তার জীবনসাধনা সীমিত রাখেননি। দুই দশক তিনি সারা দেশ ঘুরেছেন চারণের মতো। যেখানে দুর্বলের ওপর সবলের নিপীড়ন হয়েছে, প্রান্তিক মানুষ মার খেয়েছে, ছুটে গেছেন তিনি। নিরাপদ সড়ক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের ন্যায্য দাবিতে বরাবর সোচ্চার ছিলেন তিনি। কখনো তাকে দেখতাম শহীদ মিনার বা প্রেসক্লাবের সামনে ধবধবে সাদা কাপড় পরে একাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। আবার সরকার জনহিতকর কোনো কর্মসূচি নিলে তার প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। সৈয়দ মকসুদ সাধারণত সেসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করতেন, যেসব বিষয় প্রথাগত পণ্ডিতেরা উপেক্ষা করতেন। বাংলাদেশের অন্তর-বাহির জানতে সৈয়দ আবুল মকসুদকে পড়তে হবে।
দেখা হলেই তিনি তার পরবর্তী বই কিংবা গবেষণা নিয়ে কথা বলতেন। কলকাতার কোনো মুদির দোকান থেকে কীভাবে গান্ধীর ডায়েরি উদ্ধার করলেন, কীভাবে আন্ডারগ্রাউন্ড নেতাদের সঙ্গে দেখা করতেন, সেসব গল্প বলতেন।
করোনাকাল আমাদের অনেক প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়েছে, প্রথম আলোর সঙ্গে সরাসরি ও নানাভাবে যুক্ত অনেককে আমরা হারিয়েছি। প্রথমে গেলেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তারপর শিল্পী মুর্তজা বশীর, প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী, তারপর লেখক-কবি আবুল হাসনাত, সাংবাদিক মুনীরুজ্জামান, তারপর সহকর্মী মিজানুর রহমান খান ও অরুণ বসু। সবশেষে চলে গেলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।
সৈয়দ আবুল মকসুদের একটি রাজনৈতিক দর্শন ছিল। কিন্তু সেই রাজনীতির কারণে কাউকে দূরে ঠেলে দেননি, হৃদয়ের ঔদার্যে সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছেন। এই ছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।
২.
রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সংস্কৃতির সংগ্রাম যখন এক মোহনায় মিলিত হয়েছে, তখনই তা সমগ্র জনগোষ্ঠীকে আন্দোলিত করেছে। যেমন: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬১ সালের রবীন্দ্রশতবর্ষ উদযাপন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতার পর আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও দেখেছি ছাত্র-তরুণদের পর লেখক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিসেবীরাই প্রথম রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেসময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামকে শাণিত ও বেগবান করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আন্দোলন।
একটি রাজনৈতিক দলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যে গোটা জনগোষ্ঠীর সত্তাকে নাড়া দিতে পারে, ১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলনই তার প্রমাণ। এর ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখলেন, ‘কাগমারী সম্মেলন: মওলানা ভাসানীর পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম’। আমরা অনেকেই ইতিহাস ভুলে যাই এবং বর্তমানকে নিয়ে মশগুল থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু ইতিহাসে যার যেটুকু ভূমিকা, স্বীকার না করলে একদিন ইতিহাসই মুখ ফিরিয়ে নেবে।
ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘কাগমারী সম্মেলনকে সাংস্কৃতিক সম্মেলন বলে অভিহিত করা হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশাল এবং জাতির জীবনে সেই সম্মেলনের অভিঘাত হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। কাগমারী সম্মেলন থেকেই মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। এই সম্মেলনেই মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়েছিলেন।’
আসলে কাগমারী সম্মেলনটি নামে সাংস্কৃতিক সম্মেলন হলেও সেখানে অর্থনীতি, ভূমিব্যবস্থা, কৃষি, রাসায়নিক শিক্ষা, ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, নারীসহ সবকিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আর এসব বিষয়ে আলোচনা করেছেন নিজ নিজে ক্ষেত্রে পণ্ডিত ব্যক্তিরা। তাদের কেউ নিবন্ধ পাঠ করেছেন, কেউ সেই নিবন্ধের ওপর আলোচনা করেছেন। এই সম্মেলনে দেশি পণ্ডিতেরা তো ছিলেনই, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য থেকেও অতিথিরা এসেছিলেন। এসেছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকেও।
এই সম্মেলনে প্রতিবেশী ভারত থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ স্বনামধন্য লেখক-শিল্পীরা এসেছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী আবদুল ওয়াদুদ, নরেন্দ্র সেন, রাধারানী দেবী, প্রবোধকুমার সান্যাল, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী। আমাদের লোকশিল্পীদের মধ্যে রমেশ শীল, তাসের আলী, মোহসেন, রাম সিং, মজিব মিয়া, সুখেন্দু চক্রবর্তীও এই সম্মেলনে যোগ দেন।
আবার প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এ নিয়ে বিস্তর সমালোচনাও করেছে। তারা এর মধ্যে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বের করতে সচেষ্ট ছিল। কাগমারী সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ইত্তেফাক ও ইত্তেহাদের ভূমিকা পুরোপুরি বিপরীতধর্মী না হলেও প্রথমটি সোহরাওয়ার্দী গ্রুপকে এবং দ্বিতীয়টি ভাসানীকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কাগমারী সম্মেলনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের বিভাজন-প্রক্রিয়া শুরু হয়। কয়েক মাসের মাথায় মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে নতুন দল গঠিত হয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদের বইয়ে কাগমারী সম্মেলনের বিস্তারিত বিবরণ আছে। সেই সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, দিনলিপি, নোট ইত্যাদি ব্যবহার করে তিনি সম্মেলনের বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেছেন। উপসংহারে তার মন্তব্য, ‘কাগমারী সম্মেলনের ভেতর দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটে এবং সাম্প্রদায়িক মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা দুর্বল ও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’
সৈয়দ আবুল মকসুদের নজর এড়ায়নি যে বাংলাদেশের বুর্জোয়া কিংবা বাম—উভয় রাজনীতিতে সেই সম্মেলনই ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম, যাতে দলীয় সম্মেলনকে ছাপিয়ে সামনে এসেছিল লেখক-বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও দর্শন। সৈয়দ মকসুদ কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর অসামান্য ভূমিকার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি কিছু কিছু বিষয়ে তার সমালোচনাও করেছেন।
গণমানুষের নেতা ছিলেন বলেই ভাসানী বহু চিন্তাকে ধারণ করে এমন একটি বিশাল সম্মেলন আয়োজন করতে পেরেছিলেন। তাকে অনেকে ‘বিদ্রোহের বা ভাঙনের নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। কাগমারী সম্মেলন যে এ দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এক মেলবন্ধন রচনা করেছে, লেখা ও গবেষণার মাধ্যমে সেই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।
তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার রচনাগুলো ভবিষ্যতের পাথেয় হিসেবে থাকবে।
