রাজধানীর হাজারীবাগের বড়াইখালী এলাকায় এজেআর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় ওয়্যারহাউজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ৩১ লাখ টাকার মালামাল খোয়া যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ম্যানেজার আফসার উদ্দিন থানায় লিখিত এজাহার দিয়েছেন। তবে ঘটনার সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্য, পরবর্তী এজাহারের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের তথ্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন হাজারীবাগ থানার ওসি মো. মোশাররফ হোসেন।
তার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ থানায় এসে ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে মামলা করতে চাচ্ছে। তবে তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতির মামলা করার ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মেরী ডেন্টাল কলেজ রোডে সিকদার মেডিকেল কলেজের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট পরা একদল দুর্বৃত্ত ওয়্যারহাউজে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। তারা অফিসের ল্যাপটপ ও সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ে যায়। হামলাকারীরা জমির ভাড়া ক্যাপ্টেন ইমনের গ্রুপকে দিতে হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়। তাদের দাবি, এ বিষয়ে শিকদার গ্রুপের মালিকের সঙ্গে কথা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, প্রায় দুই বছর আগে শিকদার গ্রুপের কাছ থেকে চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়ে সেখানে প্রধান ওয়্যারহাউজ ও কার্যালয় স্থাপন করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী এত দিন শিকদার গ্রুপকে ভাড়া দিয়ে আসছিল এজেআর। ওই কার্যালয় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ গাড়ির মাধ্যমে সারা দেশে পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। হামলার পর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এজাহারে বাদী আফসার উদ্দিন উল্লেখ করেন, ২০ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে ৭০ থেকে ৮০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি মুখ ও মাথা ঢেকে মোটরসাইকেলে ওয়্যারহাউজে প্রবেশ করে। তারা ইনচার্জ কাজী রুহুল আমিন ও নিরাপত্তাকর্মী হারুনকে ভয়ভীতি দেখায়। পরে সার্ভার রুমের তালা ও দরজা ভেঙে মালামাল নিয়ে যায়।
এজাহার অনুযায়ী, খোয়া যাওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে একটি সার্ভার, একটি রাউটার, ৬৪ চ্যানেলের একটি, ৩২ চ্যানেলের দুটি, ১৬ চ্যানেলের দুটি ও আট চ্যানেলের দুটি এনভিআর, ১০ টেরাবাইটের আটটি হার্ডডিস্ক, দুই মেগাপিক্সেলের ৪০টি সিসিটিভি ক্যামেরা, আটটি স্পিড সুইচ, আটটি মনিটর ও একটি ল্যাপটপ। এসব মালামালের মূল্য ৩১ লাখ টাকা বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এজাহারে আরও বলা হয়, সাইফুল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় হামলা ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বাদীপক্ষের। এজাহারে সাক্ষী হিসেবে নিরাপত্তাকর্মী নালু মিয়া, সিকিউরিটি ইনচার্জ রুহুল আমিন ও হারুন আর রশিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, হাজারীবাগ থানায় ঘটনার আইনি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত একটি নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডবিধির ৩৯৫ ও ৩৯৭ ধারার পরিবর্তে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পেনাল কোডের ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৪২৭, ৩৮০, ১০৯, ৩৪, ৪৪৭, ৪৪৮, ৩৮৫ ও ২০১ ধারায় মামলা করার পক্ষে মত দেওয়া হয়েছে।
নোটে এজাহার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে চাঁদাবাজি, পূর্বশত্রুতা, অফিস দখল, ডিজিটাল যন্ত্রপাতি চুরি এবং আলামত ধ্বংসের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এতে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও ডিএলআরের নীতির উল্লেখ করে বলা হয়েছে, অপরাধের উপাদানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ধারা প্রয়োগ করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় মামলা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
হাজারীবাগ থানার ওসি মো. মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ঘটনার সময় এজেআর কর্তৃপক্ষ ক্যাপ্টেন ইমনের গ্রুপের হামলা, ভাঙচুর ও জমির ভাড়া তাদের দিতে হুমকি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। এরপর কর্মচারীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে এজাহারে ৭০ থেকে ৮০ জনের হামলা, ৩১ লাখ টাকার মালামাল লুট এবং সাইফুলের চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয়। এখন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ থানায় এসে ডাকাতির মামলা করতে চাচ্ছে এবং অন্য কোনো ধরনের মামলা করবে না বলে জানিয়েছে। কিন্তু এজাহারের অভিযোগের সঙ্গে পুলিশের তদন্তের তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। জিডি ও তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটিকে ডাকাতির মামলা হিসেবে নেওয়ার ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এজাহারে উল্লেখ করা নম্বরে যোগাযোগ করে এজেআর পার্সেল সার্ভিসের ডিলিং অফিসার আরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না জানিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরে জানাবেন বলে জানান। পরে তিনি হাজারীবাগ শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের আরেকটি নম্বর দেন। তবে ওই নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।