নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। বাজারে এসে দামের সঙ্গে হিসাব মেলাতে না পেরে অনেকে কেনাকাটার তালিকা ছোট করছেন, কমাচ্ছেন পণ্যের পরিমাণ। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। আয় না বাড়লেও বাজার খরচ বাড়ায় সংসারের খাবারের তালিকাতেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে অনেককে।
এ পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ের সুযোগ দিতে বাস্কেট সুপার শপে এ সপ্তাহে মাংস, মাছ, ফলমূল, শাকসবজি, চাল-ডাল, দুধ, চা, বিস্কুট, হিমায়িত খাবার, মধু, অলিভ অয়েল ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রীতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে নগরের কাঁচাবাজারগুলোতে কেনাকাটার চাপ বেড়েছে। তবে এ সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী যোগসাজশ করে দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহের জটিলতায় বেড়েছে পণ্যের দাম।
বৃহস্পতিবার নগরের রেয়াজউদ্দিন, বকশিরহাট ও কাজীর দেউড়ি বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারভেদে দামের পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ পণ্যের দামই ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।
সবজিতে চড়া দাম, টমেটো ২৬০ টাকা
আলু, মিষ্টিকুমড়া ও পেঁপের মতো কিছু সবজি তুলনামূলক কম দামে পাওয়া গেলেও বরবটি, বেগুন, ঝিঙে, ঢেঁড়স ও পটল বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১০০-১৪০ টাকায়। টমেটোর দাম বেড়ে হয়েছে ১৮০-২৬০ টাকা, শিম ২৪০-২৬০ টাকা। ধনেপাতা ২০০-২৫০, পুদিনাপাতা ৩৫০-৪০০, গাজর ১২০-১৬০ এবং কাঁচা মরিচ ১৪০-২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
বকশিরহাটে বাজার করতে আসা শিক্ষিকা চন্দ্রিমা চক্রবর্তী বলেন, একই টাকায় এখন আর পরিবারের প্রয়োজনীয় সবজি কেনা যাচ্ছে না। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি বাজারের বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, পাইকারি দাম, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে। সরবরাহ কম থাকায় কিছু সবজির দাম বেশি। এতে ক্রেতারা কম কিনছেন, বিক্রিও কমেছে।
মাছ-মাংসেও বাড়তি ব্যয়
মাছের বাজারে পাঙ্গাস ২৫০-৩০০, নাইলোটিকা ২৮০-৩২০, লইট্টা ২৮০-৩০০, রুই ৪৫০-৫৫০, কাতলা ৫০০-৬০০ এবং ইলিশ ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া পোয়া ৫০০, কোরাল ১ হাজার, পাবদা ৫০০-৫৫০, পুঁটি ৩০০, দেশি কই ১ হাজার ৬০০, শিং ৮০০-১ হাজার, শোল ৮০০-১ হাজার, লাক্ষা ১ হাজার ২০০, ছুরি ৩৫০, মাইট্টা ৫০০-৬০০ ও মলা ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
রেয়াজউদ্দিন বাজারের মাছ ব্যবসায়ী রুপেন দাস বলেন, সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমেছে। পরিবহন ও বরফের খরচও বেড়েছে। আগে দিনে দুই মণ মাছ বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০ কেজি।
মুরগির মধ্যে ব্রয়লার ১৮০, সোনালি ৩৫০, পাকিস্তানি কক ৪০০, দেশি সোনালি ৪৫০, লেয়ার ৩৫০, দেশি মুরগি ৬০০-৮০০, হাঁস ৮৫০ ও বেলজিয়াম হাঁস ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গরুর হাড়যুক্ত মাংস ৭৫০, হাড়হীন ৯৫০, খাসি ১ হাজার ২০০, ছাগল ১ হাজার ১৫০ এবং ভেড়ার মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি।
ফার্মের লাল ডিমের ডজন ১৫৫, সাদা ডিম ১৪৫, দেশি ডিম ২০০ ও হাঁসের ডিম ২৪০ টাকা।
চাল-ডাল ও মুদি পণ্যে চাপ
সরু চাল ৭৫-৯৫, মাঝারি চাল ৬৩-৭৫ এবং মোটা চাল ৫০-৫৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। চিনিগুঁড়া খোলা চাল ১৫০-১৭০ এবং প্যাকেটজাত চাল ২২০-২৩০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে।
খোলা আটা ৪৮-৫০, প্যাকেটজাত আটা ৬৮-৭০, খোলা ময়দা ৬২-৬৫ ও প্যাকেটজাত ময়দা ৮০-৮৫ টাকা কেজি। আমদানিকৃত মসুর ডাল ৮৫-৯০, দেশি আস্ত মসুর ১৬০-১৬৫, দেশি ছোট মুগ ১৬৫-১৭০, আমদানিকৃত মুগ ১৪৫-১৫০, ছোলা ১১৫-১২০, খেসারি ৭৫-৮৫ এবং কলাই ডাল ১৫০-১৫২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বেসনের দাম ৮০-১৬০ টাকা।
খোলা সয়াবিন তেল ১৮৯-১৯০, পাম তেল ১৬৫-১৬৮ এবং দেশি সরিষার তেল ২৩০-২৬০ টাকা। আমদানিকৃত চিনি ১০৫-১১০, লাল চিনি ১৩০, প্যাকেটজাত লবণ ৩৬-৪২ ও খোলা লবণ ২২-২৪ টাকা কেজি। দেশি পেঁয়াজ ৫০-৫৫, আমদানিকৃত রসুন ১৪০-১৬০, আদা ১৪০-১৫০, দেশি হলুদ ২২০-২৪০ এবং শুকনা মরিচ ২৫০-৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
বাস্কেট সুপার শপে এই সপ্তাহে বিশেষ ছাড়
মাংস ও মাছ
বাস্কেট সুপার শপে প্রতি কেজি গরুর মাংসে ২১ টাকা ছাড়ে দাম ৭৯৯ টাকা। ব্রয়লার মুরগিতে ২০ টাকা ছাড়ে ৩১৯ টাকা, স্যুপের মুরগিতে ১০ টাকা ছাড়ে প্রতি পিস ২০৯ টাকা এবং মুরগির রানে ৩০ টাকা ছাড়ে প্রতি কেজি ৪২৯ টাকা। মাঝারি রুই মাছে ৩০ টাকা ছাড়ে ৩৬৯ টাকা, টুনা মাছে ৩০ টাকা ছাড়ে ৪৫০ টাকা এবং বড় সাইজের কাতল মাছে ৪০ টাকা ছাড়ে ৭৫৯ টাকা।
ফলমূল ও শাকসবজি
মাল্টায় ৪০ টাকা ছাড়ে দাম ৫০৫ টাকা, লাল আঙুরে ৫০ টাকা ছাড়ে ৫০৯ টাকা এবং অস্ট্রেলিয়ান গালা আপেলে ৪০ টাকা ছাড়ে ৪২৯ টাকা। কাঁচা মরিচে ১০ টাকা ছাড়ে ১২০ টাকা, গাজরে ১৫ টাকা ছাড়ে ১৪০ টাকা এবং চীনা রসুনে ১০ টাকা ছাড়ে ১৬০ টাকা।
চাল, ডাল, আটা, মসলা ও তেল
হলুদ ও ধনিয়ার গুঁড়ায় ৪০ টাকা করে ছাড়ে দাম যথাক্রমে ৩৪০ ও ৩১০ টাকা। খেসারির ডালে ২১ টাকা ছাড়ে ৯৯ টাকা। পাঁচ লিটার স্টারশিপ ফোর্টিফায়েড সয়াবিন তেলে ২০ টাকা ছাড়ে দাম ৯৮০ টাকা। প্রাণ মিনিকেট চালের পাঁচ কেজির প্যাকে ২০ টাকা, পুষ্টি চিনিগুঁড়া চালে প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা, প্রাণ ন্যাচারাল ফাইবার আটা ও পুষ্টি সাধারণ আটায় প্রতি কেজিতে ১০ টাকা এবং পুষ্টি মসুর ডালে ১৫ টাকা ছাড় রয়েছে।
দুধ ও চা\
মার্কস ফুল ক্রিম গুঁড়া দুধে ৩০ টাকা, হ্যাপি কাউ ইনস্ট্যান্ট দুধে ২০ টাকা এবং ফার্মল্যান্ড ফুল ক্রিম দুধে ২৫ টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। সিলন ফ্যামিলি ব্লেন্ড অ্যারোমা ব্ল্যাক টির ৫০০, ৪০০ ও ২০০ গ্রামের প্যাকে যথাক্রমে ৫০, ৪০ ও ২০ টাকা ছাড় রয়েছে।
বিস্কুট, হিমায়িত খাবার ও মধু
শুন ফ্যাট ক্রিম ক্র্যাকার্স স্পেশাল বিস্কুটের ৪০০ গ্রামে ১৪০ টাকা ও ২৮০ গ্রামে ১০০ টাকা ছাড়। কান্ট্রি ন্যাচারাল স্পাইসি চিকেন নাগেটসের ২৫০ গ্রামে ২৪ টাকা এবং ডুডলস ৩এক্স স্পাইসি কোরিয়ান রামেন নুডলসের আট প্যাকে ৩০ টাকা ছাড় রয়েছে। রাজা দেশি ক্লাসিক পরোটার ১,৩০০ গ্রামের ২০ পিসে ৫০ টাকা, রোজা বাটারফ্লাই চিংড়ির ১০–১২ পিসে ২৫ টাকা এবং সাফোলা মধুর ২৫০ ও ৫০০ গ্রামের প্যাকে ৩৫ টাকা করে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও অলিভ অয়েল
প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি শ্যাম্পুর ২০০ মিলিলিটারে ৫০ টাকা এবং প্যারাস্যুট স্কিন পিওর ন্যাচারাল ময়েশ্চার বডি লোশনের ২০০ মিলিলিটারে ৬০ টাকা ছাড় রয়েছে।
অলিতালিয়া ইতালিয়ান অলিভ পোমেস বডি অয়েলের ২৫০ মিলিলিটারে ৩০ টাকা, অলিতালিয়া এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের এক লিটারে ১০০ টাকা এবং অলিও ওরোলিও এক্সট্রা ভার্জিন কোল্ড-প্রেসড অলিভ অয়েলের এক লিটারে ১২০ টাকা ছাড় দেওয়া হচ্ছে। মেরিল অরেঞ্জ রেইন ও মেরিল বেরি ব্লিস রিভাইটালাইজ শাওয়ার জেলের ২৫০ মিলিলিটারের প্রতিটিতে ৫১ টাকা ছাড় রয়েছে।
বাজার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
রেয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. আলী সওদাগর বলেন, পাইকারি ক্রয়মূল্য, পরিবহন ও দোকান পরিচালনার ব্যয় বাড়ায় খুচরা দামেও প্রভাব পড়ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন বলেন, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়মিত যাচাই এবং বাজার তদারকিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ফয়েজ উল্যাহ বলেন, মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ ও নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হচ্ছে। প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
The post মাছ-মাংস থেকে চাল-ডাল সবকিছুতেই বাড়তি দাম appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
