ভোলার চরফ্যাশন বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে লঞ্চ চলাচলে মালিকপক্ষের রোটেশন পদ্ধতির গ্যাঁড়াকলে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে রোটেশন পদ্ধতির আইনি ভিত্তি জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে এ পদ্ধতি বাতিল করে স্বাভাবিক ও প্রতিযোগিতামূলক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
জানা যায়, বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে দৈনিক তিনটি কোম্পানির এমভি কর্ণফুলী, এমভি টিপু ও এমভি তাসরিফ লঞ্চ চলাচলের জন্য বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী রুট পারমিট নেওয়া হয়েছে। শুরুতে কয়েক মাস নির্ধারিত সময়সূচি মেনে লঞ্চ চলাচল করলেও পরবর্তীতে মালিকপক্ষের পারস্পরিক সমঝোতায় রোটেশন পদ্ধতি চালু করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত দৈনিক লঞ্চ চলাচলের সময়সূচি উপেক্ষা করে মালিকপক্ষ নিজেদের সুবিধামতো এই রোটেশন পদ্ধতি চালু করেছে। এর ফলে একেক দিন একটি কোম্পানির লঞ্চ চলাচল বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। এতে যাত্রীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের অধিকার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তি বাড়ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, দেশের প্রচলিত কোনো আইন, বিধিমালা বা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে এ পদ্ধতি চালু করা হয়ে থাকলে তা প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় অবিলম্বে এ ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, লঞ্চমালিকদের ব্যবসা করার অধিকার থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে রাখার অধিকার কারও নেই। নদীপথে যাতায়াত সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে এ রুটে কাঙ্ক্ষিত যাত্রীসেবা নিশ্চিত হচ্ছে না।
চরফ্যাশন পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. কামাল হোসেন প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রতিদিনের সিডিউলে তিন কোম্পানির লঞ্চ আসা-যাওয়ার কথা থাকলেও সে আইন তারা মানছেন না। রোটেশন পদ্ধতি কি যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছে, নাকি যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরির জন্য? তাঁর অভিযোগ, নির্ধারিত কেবিনের বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাধ্য হয়ে লঞ্চের স্টাফদের জন্য নির্ধারিত ছোট কেবিন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বুকিং করতে হয়।
আছলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কেবিন বুকিং করতে না পারায় চলমান দীর্ঘ সরকারি ছুটিতেও পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি তিনি। এ ধরনের ভোগান্তি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, লঞ্চমালিকপক্ষের দাবি, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ভোলা–বরিশাল হয়ে সড়কপথে ঢাকায় যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে নৌপথে যাত্রী কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ফলে লঞ্চ পরিচালনায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ লোকসান এড়াতেই রোটেশন পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে স্কুলশিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, লঞ্চমালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের অধিকার—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তদন্ত করে সরকার বা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। মালিকপক্ষের যাত্রীসংকট ও লোকসানের যুক্তি বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি সেই সংকটের দায় যেন সাধারণ যাত্রীদের বহন করতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রোটেশন পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়ে এর আগে জনস্বার্থে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ। নোটিশে এ পদ্ধতির কারণে প্রতিযোগিতামূলক যাত্রীসেবা বাধাগ্রস্ত হওয়া, যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি এবং নৌযান চলাচলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অবিলম্বে এ ব্যবস্থা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।
