প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জনের পথেই যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঝরে যায় বাংলাদেশির প্রাণ, তখন তা কেবল কয়েকটি পরিবারের শোকের ঘটনা থাকে না; হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কূটনীতির কার্যকারিতা এবং প্রবাসী সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর পরীক্ষাও। সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার খবর সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনেছে। পরবর্তী হামলার খবর পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করেছে।
বিমানবন্দর কোনো সামরিক প্রতিশোধের সহজ লক্ষ্য হতে পারে না। এটি যাত্রী, কর্মী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সেখানে হামলায় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও বেসামরিক নিরাপত্তার মৌলিক নীতির প্রতি গুরুতর প্রশ্ন তোলে। হামলার দায় নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত জরুরি; একই সঙ্গে কোনো পক্ষের সামরিক পদক্ষেপের জবাবে আরেক পক্ষের নির্বিচার আঘাতের হুমকি পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। প্রতিশোধের ভাষা যত জোরালো হয়, শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ তত সংকুচিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আহত বাংলাদেশিদের চিকিৎসা, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁদের পরিবারের কাছে দ্রুত, নির্ভুল ও নিয়মিত তথ্য পৌঁছানোও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর তদারকি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ; তবে সংকটকালে দায়িত্বশীলতার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে মাঠপর্যায়ে সহায়তার দ্রুততা, সমন্বয় ও কার্যকারিতায়।
একই সঙ্গে প্রবাসী সুরক্ষাকে শুধু দুর্ঘটনা-পরবর্তী তৎপরতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং বিমানবন্দরে পুনরায় হামলার আশঙ্কা বিবেচনায় সৌদি আরবসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে বাংলাদেশি দূতাবাসের জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হবে। প্রবাসী, ওমরাহযাত্রী, শ্রমিক ও তাঁদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য যাচাইকৃত সতর্কবার্তা, নিরাপদ আশ্রয়ের নির্দেশনা এবং জরুরি সহায়তার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিমান চলাচল বন্ধ বা পরিবর্তিত হলে যাত্রীদের তথ্য, বিকল্প যাত্রা এবং আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ও জরুরি।
ঢাকা থেকে সৌদিগামী একাধিক ফ্লাইট বাতিল এবং যাত্রাপথ পরিবর্তনের ঘটনা দেখিয়েছে, আঞ্চলিক সংঘাতের অভিঘাত সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশের পরিবার, শ্রমবাজার ও যোগাযোগব্যবস্থায় পৌঁছে যায়। তাই ঝুঁকি মূল্যায়ন, কনস্যুলার সহায়তা এবং সংকটকালীন নাগরিক সুরক্ষার জন্য স্থায়ী আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিদেশে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তাকে শ্রম অভিবাসন নীতির কেন্দ্রীয় শর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এ সংকটে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিসরে বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনার সুরক্ষায় জোরালো অবস্থান নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে হামলা বন্ধ, সংযম এবং কার্যকর সংলাপের পথে ফেরার আহ্বান জানানো প্রয়োজন। মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে কেবল নিন্দা নয়, বাস্তব উদ্যোগই মুখ্য।
প্রবাসীর জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি প্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, যুদ্ধের হিসাবের আড়ালে যেন নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা বিসর্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করা।
সানা/আপ্র/১৩/১০/২০২৬
