সংবাদ · সাধারণ
টিআইএন থেকে রিটার্ন: ফ্রিল্যান্সার-উদ্যোক্তাদের করণীয়
২৫/১০/২০২৬

আয় শুরু করেছেন? টিআইএন, কর ও রিটার্ন সম্পর্কে শুরুতেই জানুন। ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছেন, অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছেন কিংবা নিজের একটি স্টার্টআপ গড়ে তুলছেন? আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করসংক্রান্ত কিছু দায়িত্বও আপনার সামনে আসবে। কিন্তু টিআইএন, আয়কর ও রিটার্ন নিয়ে নানা ভুল ধারণার কারণে অনেক তরুণ শুরুতেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যান। কেউ মনে করেন, টিআইএন করলেই কর দিতে হবে, আবার কেউ মনে করেন, আয় কম হলে করসংক্রান্ত কোনো দায়িত্বই নেই।বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। আয় কত, আয়ের উৎস কী, পেশা বা ব্যবসার ধরন কী এবং সংশ্লিষ্ট আইনে কী ধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এসব বিষয়ের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ভর করে। তাই আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত হিসাব রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন ব্যবসাবর্তমানে তরুণদের মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ব্যবসা ও স্টার্টআপের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই ঘরে বসে দেশি-বিদেশি গ্রাহকের কাজ করছেন। কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করছেন।এসব কর্মকাণ্ড কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে একজন ফ্রিল্যান্সারের আয় ও কার্যক্রম যেমন এক রকম নয়, তেমনি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও পার্থক্য রয়েছে। ফলে তাঁদের আয়, ব্যয়, হিসাবরক্ষণ ও কর ব্যবস্থাপনাও এক নয়। তাই শুধু অনলাইনে আয় করেন—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে সবার জন্য একই করব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।টিআইএন কেন প্রয়োজন?টিআইএন বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক করদাতাকে দেওয়া ১২ অঙ্কের একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকারী নম্বর। বিভিন্ন সরকারি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক কার্যক্রমে আইন অনুযায়ী টিআইএন এবং রিটার্নসংক্রান্ত নথির প্রয়োজন হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে টিআইএন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা একই নয়। ব্যক্তির পেশা, আয়, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানের ওপর এর প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। তাই আইন অনুযায়ী প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও টিআইএন গ্রহণ না করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি টিআইএন গ্রহণকে সরাসরি আয়কর প্রদানের সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়।টিআইএন থাকলেই কি আয়কর দিতে হয়?এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। টিআইএন হলো করদাতাকে শনাক্ত করার নম্বর। অন্যদিকে আয়কর হলো প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করযোগ্য আয়ের ওপর আরোপিত কর। অর্থাৎ, টিআইএন থাকা এবং আয়কর পরিশোধ করা একই বিষয় নয়। কারও টিআইএন থাকতে পারে, কিন্তু প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, আয় ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তার প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেও আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।তাই টিআইএন গ্রহণের পর নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও জানা জরুরি।ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় ও করফ্রিল্যান্সাররা সাধারণত নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান বা পেশাগত সেবা দিয়ে আয় করেন। তাই কাজের শুরু থেকেই আয় ও খরচের সঠিক হিসাব রাখা গুরুত্বপূর্ণ।গ্রাহকের সঙ্গে চুক্তি বা কাজের রেকর্ড, চালানপত্র, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনলাইন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। বিদেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে অর্থের উৎস, কাজের প্রকৃতি এবং অর্থ গ্রহণের রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখা প্রয়োজন।একইভাবে পেশাগত কাজ পরিচালনার জন্য যেসব খরচ হয়, সেসবের বিল, রসিদ বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা উচিত। ব্যক্তিগত ও পেশাগত লেনদেন আলাদা রাখলে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি এবং রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হয়।কোনো নির্দিষ্ট আয় করমুক্ত কি না, করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে বা বিশেষ কোনো কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।উদ্যোক্তাদের কর ব্যবস্থাপনাঅনলাইন বা অফলাইন ব্যবসা ছোট হলেও সেটি ব্যবসা। তাই শুরু থেকেই ব্যবসার আর্থিক হিসাব আলাদাভাবে রাখা উচিত। পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ক্রেতার অর্থ পরিশোধের তথ্য, পণ্য সরবরাহের খরচ, বিজ্ঞাপন ব্যয়, কর্মচারীর বেতন, অফিস বা গুদামভাড়া এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয়ের নথি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অর্থের সঙ্গে ব্যবসার অর্থ মিশিয়ে ফেললে প্রকৃত ব্যবসায়িক আয় ও ব্যয় নির্ধারণ কঠিন হয়ে যায়। এতে করযোগ্য আয় নির্ধারণ ও রিটার্ন প্রস্তুতের সময়ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্যবসার জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাব অথবা অন্তত পৃথক হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা ভালো।করযোগ্য আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে?শুধু মোট আয় কত হয়েছে, তার ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করা হয় না। আয়ের প্রকৃতি, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা, অনুমোদিত ব্যয়, কর রেয়াত, উৎসে কর্তিত কর এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করযোগ্য আয় ও প্রদেয় কর নির্ধারণ করা হয়।ফ্রিল্যান্সার বা উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে আয় ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঠিক হিসাব তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ নথি ছাড়া কোনো ব্যয়ের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে আয় ও প্রাসঙ্গিক ব্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত।উৎসে করের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণঅনেক ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তার আয় থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উৎসে কর কর্তনের প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসে কর্তিত করের তথ্য উপস্থাপন ও সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা অন্য উৎস থেকে কর কর্তন করা হলে তার প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে রাখা উচিত।রিটার্ন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?আয়কর রিটার্ন হলো নির্দিষ্ট করবর্ষে করদাতার আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য আয়কর কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিলের প্রক্রিয়া।রিটার্ন শুধু কর পরিশোধের মাধ্যম নয়, এটি করদাতার আয় ও আর্থিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক নথি। আইন অনুযায়ী যাঁদের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাঁদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল করা উচিত।কর না থাকলেও রিটার্ন লাগতে পারে‘আমার কর আসে না, তাই রিটার্ন দেব না’—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কারও প্রদেয় আয়কর শূন্য হতে পারে। তবে একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে কর না থাকলেও রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে। তাই শুধু আয়কর দিতে হবে কি না, তা জানাই যথেষ্ট নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।কর সুবিধার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজনফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য নির্দিষ্ট খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কর সুবিধা, অব্যাহতি বা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট আয় এসব সুবিধার আওতায় পড়ে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। শুধু কোনো আয়কে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়, অনলাইন ব্যবসার আয় বা প্রযুক্তি খাতের আয় হিসেবে উল্লেখ করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হয়ে যায় না। আয়ের প্রকৃতি, সেবার ধরন, কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর আইন ও বিধান বিবেচনা করেই কর সুবিধা প্রযোজ্য কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।রিটার্ন দাখিলের আগে কী প্রস্তুত রাখবেন?রিটার্ন দাখিলের আগে সারা বছরের আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য গুছিয়ে রাখা উচিত। ফ্রিল্যান্সারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের রেকর্ড, চালানপত্র, চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের রেকর্ড এবং পেশাগত খরচের প্রমাণপত্র গুরুত্বপূর্ণ।উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে বিক্রয় ও ক্রয়ের হিসাব, পণ্য ক্রয়ের চালান, বিক্রয়ের রেকর্ড, ব্যবসায়িক খরচের বিল ও ভাউচার, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং কর্মচারীর বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ের রেকর্ড সংরক্ষণ করা উচিত। এ ছাড়া জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিনিয়োগ, ঋণ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়ের তথ্যও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রস্তুত রাখতে হয়। উৎসে কর কর্তন হয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।শুরু থেকেই হিসাব রাখুনফ্রিল্যান্সার কিংবা উদ্যোক্তা, যাঁরাই হোন না কেন, আয় শুরু হওয়ার দিন থেকেই হিসাব রাখার অভ্যাস করুন। প্রতি মাসে আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখুন। ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, চালানপত্র, বিল, ভাউচার ও রসিদ সংরক্ষণ করুন। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ডও যথাযথভাবে রাখুন।এতে বছর শেষে রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা বা পেশাগত কাজের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও পরিষ্কার থাকবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকঋণ, বিনিয়োগ গ্রহণ, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের প্রয়োজন হলেও সুশৃঙ্খল হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।শুরুতেই সচেতনতা, ভবিষ্যতে স্বস্তিফ্রিল্যান্সিং বা উদ্যোক্তা হওয়ার সাফল্য শুধু কত টাকা আয় করছেন, তার ওপর নির্ভর করে না। সেই আয় কতটা সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং আইনসম্মতভাবে পরিচালনা করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।আজকের একজন ফ্রিল্যান্সার আগামী দিনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। আবার ছোট একটি অনলাইন ব্যবসাও ভবিষ্যতে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। তাই ব্যবসা বা পেশাগত আয় শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে কর ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হওয়া ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।আয় শুরু করুন, হিসাব রাখুন, করের নিয়ম জানুন এবং সময়মতো আইনগত দায়িত্ব পালন করুন। শুরুতেই সামান্য সচেতনতা ভবিষ্যতের বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।[লেখক: আয়কর আইনজীবী]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗