জামালপুরের একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। বয়স কম, সামনে পড়াশোনা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু বন্ধুর প্ররোচনায় ইয়াবা সেবন শুরু করে সে। প্রথমে বিনা মূল্যে, পরে নিয়মিত। এখন নেশার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। নেশা ছাড়তে চাইলেও সহজে পারছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী জানায়, প্রেমঘটিত হতাশার সময় এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে ইয়াবার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। প্রথমে বলা হয়েছিল, এটি সেবন করলে মন ভালো থাকবে, পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়বে। কয়েক দিন বিনা মূল্যে সেবনের পর ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে সে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থী জানায়, শুরুতে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু দুই-তিন দিনের মধ্যেই বুঝতে পারে, পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরে প্রতিদিন এক থেকে দুটি ইয়াবা সেবন করতে শুরু করে। প্রতিটি বড়ি কিনতে খরচ হয় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। কখনো কখনো দিনে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয় নেশার পেছনে।

তার ভাষ্য, পরিচিত কারও মাধ্যমে ফোন বা মুঠোবার্তায় যোগাযোগ করলে মোটরসাইকেলে করে নির্দিষ্ট জায়গায় কিংবা বাসায় ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এভাবে মাদক পেতে হলে বিক্রেতার সঙ্গে পরিচিত কেউ থাকতে হয়। এখন নেশা ছাড়তে চাইলেও অভ্যাসের কারণে বারবার একই পথে ফিরে যেতে হচ্ছে তাকে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে সে।
বিজ্ঞাপন
শুধু এই শিক্ষার্থীই নয় জামালপুর শহরের অলিগলি থেকে গ্রাম ও চরাঞ্চল পর্যন্ত মাদকের এমন বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার ও গ্রেফতারের পরও থামছে না বিস্তার। সহজলভ্যতার এই চিত্র মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
ফোনে যোগাযোগ, মিলছে মাদক
স্থানীয়দের অভিযোগ, জামালপুর শহরের বিভিন্ন অলিগলি ছাড়াও আশপাশের গ্রাম ও চরাঞ্চলে ইয়াবার বিস্তার ঘটছে। মাদক কারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে ক্রেতার কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। কোথাও নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার কোথাও মুঠোফোনে যোগাযোগের পর সরবরাহ করা হচ্ছে।
জেলার মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা লেনদেন করা হয়। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকের সহজলভ্যতা কিশোর-তরুণদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কৈশোরের হতাশা, কৌতূহল, বন্ধুদের চাপ কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। একবার আসক্ত হয়ে গেলে পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অভিযানে উদ্ধার হাজারো ইয়াবা, তবু উদ্বেগ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জামালপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক বছরে জেলায় ৯৩৪টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ৫ হাজার ৩৬৬টি ইয়াবা বড়ি, ১২ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া এবং ১ হাজার ২০৫টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মাদকসংক্রান্ত ১ হাজার ৪১৮টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজার ১৮৪ জন। এ সময়ে ৫৯ হাজার ১০৯টি ইয়াবা বড়ি, ৩১২ কেজি ৬৮৬ গ্রাম গাঁজা, ৯৮৯ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ৪৮০ বোতল ফেনসিডিল এবং ৫ হাজার ৪৭৯টি ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৪৬০ টাকা।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় ৪২ হাজার ৮৫৪টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১৬ হাজার ২৫৫টি।
বড় চালান উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে জেলায়। ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর জামালপুর সদর এলাকায় একটি পর্যটকবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ২২ হাজার ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ছিল ৬৬ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন

মাদক ঘিরে সংঘাত ও অপরাধ
মাদককে কেন্দ্র করে সংঘাত ও অপরাধের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মেলান্দহ উপজেলার শ্যামপুর ইউনিয়নের চর-২ এলাকায় মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি এনামুল হককে (৩০) গ্রেপ্তার করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় চার পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনায় জাগো নিউজেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এর আগেও জেলায় মাদককে কেন্দ্র করে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালের ২১ মে রশিদপুর এলাকায় মাদকের টাকার জন্য আবদুর রশিদ (৬৫) নামের এক ব্যক্তিকে তার ছেলে রিপন মিয়া হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। একই বছরের ৮ জুন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবেল হত্যার ঘটনায় রিয়াদ (১৬) নামের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাদকের ৬৫ টাকা নিয়ে বিরোধ ছিল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ।
পরিবার ও সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নাজির হোসেন বলেন, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গলি ও নির্দিষ্ট স্থানে তরুণদের জটলা দেখা যায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবন ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তার ভাষায়, চোখের সামনে একটি পুরো প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
বিজ্ঞাপন
জামালপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো, পরিবার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সহজে মাদক পাওয়ার সুযোগ তরুণদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়ানো এবং পরিবার থেকে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের অবসর সময় খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিজ্ঞাপন

জামালপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে মাদক থেকে দূরে রাখা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এ জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাদকের বিস্তার রোধে পরিবারকেও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধুদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা মাদকের ঝুঁকি থেকে দূরে থাকতে পারে।
জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ইয়াহিয়া আল মামুন বলেন, অধিকাংশ মাদক সীমান্তপথে দেশে প্রবেশ করে। সীমান্ত এলাকায় পুলিশের সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সীমিত থাকায় মাদক প্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে। সীমান্তে মাদক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর সরবরাহ কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখতে হবে।
আরআইডি/কেএইচকে/এএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
