সংবাদ · সাধারণ
শামসুর রাহমানের সাহিত্য: স্থানিকতা ও ভৌগোলিক যোগসূত্র
২৩/১০/২০২৬

শামসুর রাহমানের সাহিত্যে স্থানিক ও ভৌগোলিক যোগসূত্র নির্মাণ এবং বিশ্লেষণে হোমি কে. ভাবার ‘দি লোকেশন অব কালচার’-এর তাত্ত্বিক আলোয় উঠে আসে যে, ঢাকা শহরকে একটি ভৌগোলিক পটভূমি হিসাবে গণ্য করা হয়নি; বরং তাকে ঔপনিবেশিক স্মৃতি, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ব্যক্তিগত বিষণ্নতার সংঘর্ষে উদ্ভূত একটি ‘তৃতীয় পরিসর’ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়— যেখানে সাংস্কৃতিক সংকরায়ণ, দ্ব্যর্থকতা, অনুকরণ এবং উদ্বাস্তু ধারণাগুলির নিরন্তর ক্রিয়াশীল বলে প্রতীয়মান। রমনা, বুড়িগঙ্গা, সদরঘাট, শহীদ মিনার, প্রেসক্লাব-সন্নিহিত সংবাদপত্র-কার্যালয় এবং পুরান ঢাকার সংকীর্ণ পল্লি— এইসব স্থাননামকে কেন্দ্র করে স্থানিক ও ভৌগোলিক যোগসূত্র তাঁর সাহিত্যে নির্মিত হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত পাঠক্রম এই প্রবন্ধে তুলে আনার চেষ্টা থাকবে। ভাষা-আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন— এই চতুর্বিধ ঐতিহাসিক পর্বের মধ্য দিয়ে ঢাকা শহর যেভাবে ক্রমাগত পুনর্লিখিত হয়েছে এবং পর্যালোচনায় সামগ্রিকভাবে এটি প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাওয়া যায়— শামসুর রাহমানের সাহিত্যকর্মে ঢাকা কোনো স্থিতিশীল স্থানিক ও ভৌগোলিক সত্তা হিসাবে নয়, বরং একটি নিরন্তর দ্বন্দ্বসংকুল ও পুনর্নির্মীয়মাণ সাংস্কৃতিক পরিসর হিসাবেই বিরাজমান।বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানের নাম উচ্চারিত হলে কিছু চিত্রকল্পটি অনিবার্যভাবে উদ্ভাসিত হয়— রমনার সবুজ চত্বর, বায়তুল মোকাররমের চূড়া, বুড়িগঙ্গার কর্দমাক্ত জলধারা এবং পুরান ঢাকার সংকীর্ণ অলিগলি দ্বারা রচিত এক ঘনিষ্ঠ শহুরে বাস্তবতা এবং এটি লক্ষণীয় যে, তাঁর কাব্যে— যেমন ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বন্দী শিবির থেকে’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’, কিংবা ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’— এবং আত্মজৈবনিক ‘কালের ধুলোয় লেখা’-তে ঢাকা শহর নিছক আনুষঙ্গিক ভৌগোলিক উল্লেখ হিসাবে উপস্থাপিত হয়নি; বরং তা কবির অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে নির্মিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক নগর-পরিকল্পনা, দেশভাগ-পরবর্তী জনস্রোত এবং মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর জাতীয় পুনর্গঠন— এই ত্রিবিধ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ঢাকার ভৌত ও সাংস্কৃতিক অবয়বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শামসুর রাহমানের সাহিত্যে প্রতিফলিত ঢাকা-চিত্রকে নিছক বর্ণনামূলক প্রেক্ষাপট হিসাবে না দেখে একটি সংকরায়িত ও দ্বন্দ্বসংকুল সাংস্কৃতিক পরিসর হিসাবে পাঠ করাই শ্রেয়তর; অধিকন্তু, এটিও স্মরণীয় যে, ঢাকা শহর একদা মুঘল সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক শাসনামলে তা প্রাদেশিক গুরুত্ব লাভ করে এবং সর্বশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসাবে তার বর্তমান পরিচিতি নির্ধারিত হয়েছে এবং এই বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক রূপান্তরের প্রতিটি পর্বই ঢাকার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক অবয়বে এক একটি নূতন স্তর সংযোজন করেছে বলে গণ্য হয়ে থাকে, ফলে শহরটিকে কোনো একরৈখিক আখ্যানের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা দুরূহ বলে প্রতীয়মান হয়। শামসুর রাহমান ১৯২৯ সাল থেকে জীবনের সমগ্র কালপর্ব এই শহরেই যাপন করেছেন এবং প্রত্যক্ষভাবে ভাষা-আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের সাক্ষী হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকেন, তাঁর সাহিত্যে ঢাকার যে বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক ভাষ্য প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে একটি সমাজভাষাতাত্ত্বিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্পাঠ করা সহজতর হয়— ‘আমি এই নগরীর প্রতিটি অলিগলির সঙ্গে আমার আত্মার এক গোপন সংযোগ অনুভব করি।’ —যার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসত্তা ও নগরসত্তার মধ্যকার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনটি সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিতবাহী হয়ে ওঠে।হোমি কে. ভাবা ‘দি লোকেশন অব কালচার’ (১৯৯৪) গ্রন্থে যে তত্ত্বকাঠামো নির্মাণ করেছেন— সংস্কৃতিকে কোনো স্থিতিশীল বা সমসত্ত্ব সত্তা হিসাবে বিবেচনা করা হয়নি; বরং তাকে একটি নিরন্তর আলোচনা-প্রক্রিয়া হিসাবে দেখানো হয়েছে, যা দুই বা ততোধিক সাংস্কৃতিক অবস্থানের মধ্যবর্তী এক অনির্ধারিত পরিসরে— যাকে তিনি ‘তৃতীয় পরিসর’ আখ্যা দিয়েছেন— রচিত হয়। ভাবার মতে, এই তৃতীয় পরিসরেই সাংস্কৃতিক অর্থের সংকরায়ণ সংঘটিত হয় এবং ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব ও ঔপনিবেশিত প্রজার মধ্যকার সম্পর্ক ‘অনুকরণ’ ও ‘দ্ব্যর্থকতা’-এর মাধ্যমে পুনর্বিন্যস্ত হয়ে থাকে; এছাড়া উদ্বাস্তুপনার ধারণাটিও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা নির্দেশিত হয়, যেখানে ব্যক্তি নিজ পরিচিত গৃহপরিসরের মধ্যেই এক অপরিচিত, বিচ্ছিন্ন অনুভূতির সম্মুখীন হয়। এটি ছাড়াও, ভাবার ডিসেমিন্যাশন প্রবন্ধে উপস্থাপিত জাতি-নির্মাণের ডাবল টেম্পরালিটি বিষয়ক ধারণাটিও এই আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মাধ্যমে জাতিকে একই সঙ্গে একটি ‘শিক্ষামূলক’ স্থিতিশীল ঐতিহাসিক আখ্যান এবং একটি ‘সম্পাদনামূলক’ নিত্য-পুনরাবৃত্ত বর্তমান অভিজ্ঞতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়; ঢাকা শহরকেও এই দ্বৈত সাময়িকতার প্রতিফলনক্ষেত্র হিসাবে পাঠ করা যেতে পারে, যেখানে মুঘল-ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং সমসাময়িক নাগরিক জীবনযাপন একই ভৌগোলিক পরিসরে একযোগে সক্রিয় থাকে। অধিকন্তু, ভাবার ‘সাংস্কৃতিক পার্থক্য’ ও ‘সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য— এর মধ্যকার যে সূক্ষ্ম পার্থক্যরেখা টানা হয়েছে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য একাধিক পূর্ব-বিদ্যমান সংস্কৃতির সহাবস্থানকে নির্দেশ করে, পক্ষান্তরে সাংস্কৃতিক পার্থক্য সেই প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে যার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অর্থ নিরন্তর নূতনভাবে উচ্চারিত ও পুনর্নির্মিত হতে থাকে এবং এই তাত্ত্বিক প্রতর্কের নিরিখেই শামসুর রাহমানের ঢাকা-বিষয়ক লেখাগুলোয় বিশেষত কবিতায় চিত্রিত নগরটি ঔপনিবেশিক স্থাপত্য-উত্তরাধিকার এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার সংঘর্ষে গঠিত এক সংকরায়িত হাইব্রিড ল্যান্ডস্কেপকেই নির্দেশ করে। হোমি কে. ভাবা স্টিরিওটাইপ বা গণ্ডিবদ্ধ প্রতিচ্ছবি-নির্মাণের যে প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন, তাও ঢাকা শহরের ঔপনিবেশিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক এবং ঔপনিবেশিক ভ্রমণকাহিনি ও প্রশাসনিক নথিপত্রে ঢাকাকে প্রায়শই একটি ‘পশ্চাৎপদ’, ‘অস্বাস্থ্যকর’ ও ‘বিশৃঙ্খল’ প্রাচ্য নগর, স্থিরীকৃত ঔপনিবেশিক জ্ঞানকাঠামোর দৃষ্টান্ত হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে এবং শামসুর রাহমানের সাহিত্যে এই গণ্ডিবদ্ধ প্রতিচ্ছবির বিপরীতে একটি বহুমাত্রিক, প্রাণবন্ত ও মানবিক ঢাকা-চিত্র নির্মিত হয়েছে, যার দ্বারা ঔপনিবেশিক স্টেরিওটাইপের প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদ সম্পাদিত হয়ে থাকে বলে বিবেচিত হতে পারে।শামসুর রাহমানের কবিতায় ঢাকার যে স্থাপত্যিক অভিজ্ঞান বারংবার উল্লিখিত হয়েছে— যথা, পুরাতন হাইকোর্ট ভবন, রমনা কালীবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, কার্জন হল, কিংবা ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলস্টেশন— তা ভাবার তত্ত্বানুসারে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার এক প্রকার স্থাপত্যিক ‘অনুকরণ’-স্মারক হিসাবে পাঠযোগ্য বলে প্রতিভাত হয়। যদিও এই স্থাপনাসমূহ মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই নির্মিত হয়েছিল, তথাপি স্বাধীনতা-উত্তরকালে তারা বাঙালি জাতীয় স্মৃতির ধারক হিসাবে পুনর্বিনিয়োজিত হয়েছে এবং এই দ্বৈত অর্থবহতাই— অর্থাৎ, একই স্থাপত্যিক পরিসর যেভাবে একদা ঔপনিবেশিক আধিপত্যের প্রতীক এবং পরবর্তীকালে জাতীয় গৌরবের স্মারক, উভয়রূপেই কার্যকর হয়ে থাকে— ভাবা-কথিত ‘দ্ব্যর্থকতা’-র এক প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে— “তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা,/আর কতকাল/রক্ত ঝরাতে হবে পিতা-পুত্রকে?”— তখন এই উক্তির মধ্য দিয়ে ঢাকা শহরের রাজপথ, যেখানে ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস অঙ্কিত হয়েছে, একটি সংকরায়িত স্মৃতি-পরিসর হিসাবে পুনর্নির্মিত হয়েছে বলে বলা যেতে পারে এবং রাজপথ, চত্বর ও প্রশাসনিক ভবনসমূহ যে উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের সুষ্ঠু পরিচালনার সঙ্গে সম্পর্কিত; অথচ পরবর্তীতে সেই একই স্থাপত্যিক অবকাঠামো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিবাদী মিছিল, সমাবেশ ও স্মৃতিচারণের কেন্দ্রস্থল হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকে এবং এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকেই ভাবা কলোনিয়াল মিমিক্রির বিপরীতমুখী প্রয়োগ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে ঔপনিবেশিত জনগোষ্ঠী কর্তৃক ঔপনিবেশিক প্রতীকসমূহ নিজস্ব প্রতিরোধী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে এবং শামসুর রাহমানের কবিতায় এই প্রকার পুনর্বিনিয়োগ প্রক্রিয়া বিশেষভাবে সুস্পষ্ট, যেহেতু তিনি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকে জাতীয় প্রতিরোধের রূপক হিসাবে বারংবার ব্যবহার দেখা যায়।‘কালের ধুলোয় লেখা’ শীর্ষক আত্মজৈবনিক আখ্যানে শৈশবের মহুতটুলি অঞ্চলের যে বর্ণনা প্রদত্ত হয়েছে, তাতে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি এক অবিচ্ছেদ্য গ্রন্থিতে আবদ্ধ হয়ে প্রতিভাত হয়। এই বর্ণনায় ভাবা-কথিত উদ্বাস্তু ধারণাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য বলে মনে করা হয়, যেহেতু নিজ জন্মভূমির অন্তরঙ্গ পরিসরটিই কবির নিকট ক্রমশ অপরিচিত ও বিপদসংকুল হয়ে উঠেছিল বলে বর্ণিত হয়েছে। অধিকন্তু, তাঁহার নগর-কেন্দ্রিক অসংখ্য কবিতায়— যেখানে নিঃসঙ্গ পথিক, জনারণ্যে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিসত্তা এবং যান্ত্রিক নগরজীবনের প্রতি এক গভীর বিতৃষ্ণা বারংবার প্রকাশিত হয়েছে— ঢাকা শহরকে এক প্রকার ‘গৃহ’ ও ‘পরবাস’-এর মধ্যবর্তী দোদুল্যমান পরিসর হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং এই দোদুল্যমানতাই, ভাবার তত্ত্বানুসারে, উপনিবেশোত্তর নাগরিক সত্তার এক অনিবার্য মনস্তাত্ত্বিক লক্ষণ বলে গণ্য হয়ে থাকে, যেখানে পরিচিতি ও বিচ্যুতি, আত্মীয়তা ও বিচ্ছিন্নতা— এই বিপরীতধর্মী অনুভূতিদ্বয় একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে এবং শামসুর রাহমান যখন শৈশবের প্রতিবেশকে স্মরণ করে লিখেছেন, তখন সেই স্মৃতিচারণায় নস্টালজিয়া ও ভীতি— উভয় অনুভূতিই একত্রে বিরাজমান থাকে, যা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিগত গৃহপরিসরও ঔপনিবেশিক-উত্তর সামাজিক টানাপোড়েনের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি— এটি ছাড়াও, নগরায়ণের দ্রুত অগ্রগতির ফলে পুরাতন পাড়াসমূহ যেভাবে ভেঙে নূতন করে গড়ে উঠছে, সেই প্রক্রিয়াকেও কবি এক প্রকার বেদনাদায়ক বিচ্ছিন্নতা হিসাবে অনুভব করেছেন বলে একাধিক রচনায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় এবং ঢাকা শহর কবির নিকট একদিকে যেমন আত্মপরিচয়ের উৎস, অন্যদিকে তেমনি এক ক্রমপরিবর্তনশীল, অচেনা হয়ে ওঠা পরিসর— এই দ্বৈততাই তাঁহার নগর-কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।ভৌগোলিক যোগসূত্র ও জাতীয় সংহতির নির্মাণ যেন শামসুর রাহমানের সাহিত্যে ঢাকার নির্দিষ্ট স্থাননামসমূহ— যেমন শহিদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, কিংবা আজিমপুর কবরস্থান— যেভাবে পুনঃপুনঃ আবর্তিত হয়েছে, তাতে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক যোগসূত্র নির্মিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামষ্টিক জাতীয় ইতিহাস এক অভিন্ন সূত্রে গ্রথিত হয়ে উঠেছে। “আসাদের শার্ট” কবিতায় যেভাবে একটি রক্তরঞ্জিত পোশাক ঢাকার রাজপথের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে, তা ভাবা-কথিত সাংস্কৃতিক অনুবাদেও একটি প্রণিধানযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেখানে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি একটি নগর-ভিত্তিক সামষ্টিক প্রতীকে উত্তরিত হয়ে থাকে। শামসুর রাহমানের কাব্যভাষায় ঢাকা শহর কেবল একটি প্রশাসনিক রাজধানী হিসাবে অঙ্কিত হয়নি; বরং তাকে এক ‘জীবন্ত পাঠ্য’ হিসাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যা ঔপনিবেশিক অতীত, জাতীয়তাবাদী বর্তমান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী তৃতীয় পরিসরে অবস্থান করে থাকে— “এই শহরে আমার আপন ঠিকানা নেই, / তবু এই শহরই আমাকে ঠিকানা দিয়েছে।”—এই পঙক্তিদ্বয়ের মধ্য দিয়ে ঢাকার প্রতি কবির যে দ্বৈরথমূলক সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে, তা ভাবার তৃতীয় পরিসর তত্ত্বের একটি মূর্ত রূপায়ণ বলে বিবেচিত— এটি ছাড়াও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থাপনা— যেমন মধুর ক্যান্টিন, কলাভবন ও কার্জন হল— কবির অসংখ্য রচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ ও ছাত্র-আন্দোলনের প্রতীকী কেন্দ্র হিসাবে বারংবার উপস্থাপিত হয়েছে, যার দ্বারা একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানিক ভৌগোলিক পরিসরের সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক চেতনার সংযোগ সুদঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।নদী, জলাভূমি ও সীমান্তবর্তী পরিসরের রূপকল্প যেমন বুড়িগঙ্গা নদী, যা ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংশ্লিষ্ট; শামসুর রাহমানের কাব্যভাষায় নিছক একটি প্রাকৃতিক জলধারা হিসাবে বিবেচিত হয়নি, বরং তাকে নগর ও গ্রাম, অতীত ও বর্তমান, শুদ্ধতা ও কলুষতার মধ্যবর্তী এক সীমান্তরেখা হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। ভাবার তত্ত্বানুসারে সীমান্তবর্তী পরিসরই সাংস্কৃতিক সংকরায়ণের প্রকৃষ্ট ক্ষেত্র হিসাবে গণ্য, সেহেতু বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সদরঘাট অঞ্চল, যেখানে গ্রামীণ জনস্রোত ও নাগরিক ব্যস্ততা একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে, তাকে এক প্রকার জীবন্ত ‘তৃতীয় পরিসর’ হিসাবে পাঠ করা সংগত বলে প্রতীয়মান হয়; অধিকন্তু, নদীর দূষণ ও তার ঐতিহাসিক গৌরবের মধ্যকার যে বৈপরীত্য কবিতায় বারংবার নির্দেশিত হয়েছে, তার দ্বারা ঔপনিবেশিক-উত্তর নগরায়নের এক গভীর সংকটও ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়— “নদী যেমন তার আপন গতিপথ ভুলে যায় না, নগরও তেমনি তার প্রথম জন্মস্মৃতি সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হতে পারে না।” —এই উক্তির মধ্য দিয়ে নগর ও নদীর মধ্যকার যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কটি স্পষ্ট; শামসুর রাহমানের কাব্যদর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচিত; তদুপরি, সদরঘাটের লঞ্চঘাট ও তৎসংলগ্ন বাজার-পরিসরকেও কবি এক প্রকার সাংস্কৃতিক সংযোগস্থল হিসাবে চিত্রিত করেছেন, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষের ভাষা, পোশাক ও জীবনাচরণ একই ভৌগোলিক বিন্দুতে সমাগত হয়ে এক প্রকার অনির্ধারিত সাংস্কৃতিক মিশ্রণ সৃষ্টি করে থাকে, যাকে ভাবার পরিভাষায় ইন-বিটুইননেস-এর একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসাবে অভিহিত।স্বৈরাচার-বিরোধী কাল ও প্রতিরোধের নগর-পরিসর এবং এরশাদ-বিরোধী স্বৈরাচার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত কবিতাসমূহে ঢাকা শহরের রাজপথ, বিশেষত শাহবাগ ও নিউমার্কেট সংলগ্ন অঞ্চল, প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের এক প্রতীকী মঞ্চ হিসাবে পুনর্নির্মিত হয়েছে বলে লক্ষিত হয়; ভাবার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারে, এই পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াকে সাংস্কৃতিক ‘পুনর্লিখন’, যার দ্বারা ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে জনতার প্রতিরোধ একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরের সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়ে এবং ঢাকা শহরের প্রতিটি প্রধান সড়ক ও চত্বর— যা একদা কেবলমাত্র যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হইত— ক্রমে ক্রমে সামষ্টিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনার ধারক হিসাবে রূপান্তরিত হয়েছে বলে প্রতিপন্ন হয় এবং এই প্রক্রিয়াটিকেই ভাবা-কথিত সাংস্কৃতিক সংকরায়ণের এক রাজনৈতিক প্রকাশ; যেখানে ভৌত পরিসর ও রাজনৈতিক চেতনা একে অপরের মধ্যে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশ্রিত— তদুপরি, স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনকালে রচিত কবিতাসমূহে সামরিক শাসনের প্রতীক হিসাবে যে ব্যারিকেড, টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়া ও পুলিশি প্রহরার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তার বিপরীতে জনতার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও মিছিলের চিত্রও সমান্তরালভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যার ফলে ঢাকার রাজপথ একটি দ্বৈরথমূলক শক্তি-প্রদর্শনের মঞ্চ হিসাবে রূপান্তরিত হয়ে উঠেছে বলে বিবেচিত হতে পারে। একুশে, শহিদ মিনার ও ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি-ভূগোল যেন ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত শহিদ মিনার, যা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত, শামসুর রাহমানের কবিতায় একটি পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় স্মৃতি-ভূগোলের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে লক্ষিত হয় এবং প্রতি বৎসর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে যে সহস্র সহস্র মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণের জন্য এই স্থানে সমবেত হয়ে থাকেন, তাদের এই যৌথ আচরণকেই ভাবার পারফরমোটিভ জাতীয়তাবাদের একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত— যেখানে জাতীয় পরিচিতি কোনো স্থিতিশীল ঐতিহাসিক তথ্য হিসাব নয়, বরং একটি পুনরাবৃত্ত আচারিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবৎসর নতুনভাবে আবিভূর্ত।শামসুর রাহমানের একুশে-বিষয়ক কবিতাসমূহে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণকে কেবল একটি স্মারক-স্থাপনা নয়, বরং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসর হিসাবে চিত্রিত, ভাষাশহীদদের রক্তস্মৃতি এবং সমসাময়িক প্রজন্মের ভাষাচর্চা একই ভৌগোলিক বিন্দুতে সংযুক্ত হয়ে থাকে এবং এই সংযোগ প্রক্রিয়াকেই ভাবা-কথিত ‘দ্বৈত সাময়িকতা’-র একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ; অতীতের আত্মত্যাগ ও বর্তমানের শ্রদ্ধাঞ্জলি— উভয়ই একই স্থানে, একই সময়ে, একটি অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বারান্দা ও তৎসংলগ্ন রাজপথ যেভাবে প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল, তাও কবির রচনায় বারংবার স্মরণ করা হয়েছে। (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় পড়ুন)
মূল প্রতিবেদনে যান ↗